দেশের অনেকগুলো মিডিয়া হাউসে কাজ শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম একটি জাতীয় দৈনিক বের করব। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিলাম আর হয়ে গেল বিষয়টি তো আর সেরকম না। তবে পাগলামি হোক আর যা-ই হোক একটি মিডিয়াভুক্ত জাতীয় দৈনিক সাহস করে নিয়ে নিলাম। দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার বাবর ভাইয়ের হাতে কিছু টাকা দিয়ে তার পত্রিকায় ফোর কালার বিজ্ঞাপন দিলাম। পত্রিকার তখনকার বিজ্ঞাপন ইনচার্জ হাতে টাকা নিয়ে বললেন, এটা কী করে সম্ভব? বাবর ভাই তখন বললেন, টাকাটা রেখে দিন এবং পরপর পাঁচ দিন ফোর কালার বিজ্ঞাপনটা ছেপে দিন। বাবর ভাইয়ের সহযোগিতায় পত্রিকা প্রকাশে নেমে পড়লাম।
অফিস নিলাম শান্তিনগর মোড় এলাকায়। অফিস ভাড়া করার সময় ইমারতের মালিক মালেক ভাই আমাকে দেখে বললেন, আপনার বাড়ি কোথায়? আমি বললাম, বিক্রমপুর। এ নাম শুনেই তিনি বড় ধরনের একটা হোঁচট খেলেন। খানদানি লোক। তার এলাকায় আমার বাড়ি। এটা শোনার পর অফিস ভাড়া দেওয়ার যত ধরনের নিয়মকানুন রয়েছে তার সবই তিনি শিথিল করলেন। আমাকে তার পাঁচতলার একটি ফ্লোর ভাড়া দিলেন। অমায়িক মানুষ। তিনি তার দপ্তরে আসেন প্রতিদিন দুপুরে। এসেই তিনি অফিসে না বসে পাঁচতলায় আমার পত্রিকা অফিসে চলে আসেন। অনেক কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি নিয়মিত আমার অফিসে আসেন বলে, তার জন্য পল্টন থেকে চা এনে ফ্লাস্কে করে রেখে দিই। তিনি এলে একসঙ্গে চা পান করি, সেই সঙ্গে গ্রামের গল্প এমনকি দেশের গল্পও চলতে থাকে।
পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে আল মুজাদ্দেদের সম্পাদকীয় বিভাগ থেকে আলাউদ্দিন ভাই এবং মফস্বলের বাদল ভাই এসে জয়েন করলেন। তাদের সঙ্গে আমি আগে কাজ করেছি। বাদল ভাই বললেন, আপনাকে কী স্যার বলে সম্বোধন করতে হবে। আমি মৃদু হাসলাম। বলে কী এ লোক। আমি তখন বললাম, ভাই বললেই হবে। একটি পত্রিকার কর্মীরা হলো তার অন্তপ্রাণ। জোটবদ্ধভাবে এবং আন্তরিকতা না থাকলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো যায় না। সম্পাদক আর তার অধস্তনদের সঙ্গে একটা দেয়াল থাকলে কী করে কাজ করব। আমার অফিস দেখার জন্য মানজমিনের বাবর ভাইও ছুটে এলেন। বুদ্ধি-পরামর্শ দিলেন। মফস্বল থেকে সাংবাদিকরা বায়োডাটা পাঠানো শুরু করলেন। নাটোর থেকে ইতিমনি নামে একজন নাটোরের ১০ কেজি কাঁচা গোল্লা নিয়ে আমার অফিসে হাজির হলেন। কালিহাতী উপজেলা থেকে একজন প্রতিনিধি পারে তো টাঙ্গাইলের চমচমের পুরো দোকান তুলে নিয়ে আসেন আমার জন্য। চারদিক থেকে এলাহি কারবার শুরু হতে লাগল। পত্রিকা বাজারে দিতে দিতে গভীর রাত হয়ে যায়।
পত্রিকা চালাতে যে ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয় তা আমার বেলায় ঘটেনি। তার অন্যতম কারণ—বিজ্ঞাপনের ষোলো আনা পথই আমার জানা। এভাবেই চলছে আমার পত্রিকার কাজ।
একদিন ভবনের মালিক মালেক ভাই আমার সামনে বসা। তাকে বললাম, মালেক ভাই আপনি আমাদের সঙ্গে রমনা পার্কে ব্যায়াম করতে আসেন। তাতে শরীর ও স্বাস্থ্য দুটিই ভালো থাকবে। তিনি বললেন, আমি সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারি না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি ঘুম থেকে কখন উঠেন? তিনি বললেন, বেলা ১১টায়। এ কথা শুনে আমি একটা হোঁচট খেলাম। কেন মালেক ভাই, আপনি এত দেরি করে ঘুম থেকে উঠেন? তিনি বললেন, রাত জেগে আমি একটু খাই-টাই। এজন্য সকালে উঠতে পারি না। তখন আমি বললাম, আপনি প্রতিদিন ফজরের নামাজ আদায় করবেন। তাহলেই তাড়াতাড়ি উঠতে পারবেন। তখন মালেক ভাই আমাকে বললেন, আরে কী যে বলেন ফিরোজ ভাই। বয়স আরেকটু হোক। তখন নামাজ পড়ব। সেদিন তার সঙ্গে অনেক কথা হলো। আমার এলাকার লোক। তাই সব বিষয় নিয়েই তার সঙ্গে আমি কথা বলি, গল্প করি।
শত ব্যস্ততার মধ্যেও আমি ফজরের নামাজ আদায় করে সামান্য নাশতা করি। তারপর রুটিনমাফিক আমার পল্টনের ভাড়া বাসা থেকে রমনা পার্কে যাই ব্যায়াম করতে। পার্কে অনেকগুলো ব্যায়াম করার সংগঠন রয়েছে। সেখানে সব পেশা-শ্রেণির মানুষ ভোরে একসঙ্গে ব্যায়াম করে থাকেন। প্রতি শুক্রবার স্বেচ্ছায় একজন দায়িত্ব নেন সবাইকে খাওয়ানোর। আমার পালা যখন আসে তখন ফখরুদ্দিন বাবুর্চির তেহারি খাওয়ানোর ঘোষণা দিলাম। ২০০ সদস্যের জন্য খাবার অর্ডার করলাম। তখনকার সময়ে ফখরুদ্দিন বাবুর্চির এক প্যাকেট মোরগ পোলাওয়ের দাম ছিল ৩৫ টাকা। একজন সদস্য রয়েছেন তিনি প্রতি শুক্রবার ভোরে আমাদের জন্য বিনামূল্যে পানির ব্যবস্থা করে থাকেন। তিনি থাকেন পুরান ঢাকায়। তার নামটি এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। শত আনন্দ-বেদনার মধ্যেও ঢাকার রমনায় ব্যায়াম করতে যেতাম। সেখানেই আমার জীবনের প্রকৃত সময়গুলো অতিবাহিত করতে পেরেছি। তাদের অনেকেরই সঙ্গে কয়েক যুগ হলো এখন আর দেখা হয় না। ভোরের সেই সাথিদের এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই আমি।
অনেক দিন পরের ঘটনা। আমার পত্রিকা অফিস অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছি। মালেক ভাইয়ের সঙ্গে অনেক দিন হলো কথা হয় না, দেখা হয় না। এমনকি একসঙ্গে চা পান হয় না। কেন যেন সেদিন শান্তিনগর মোড় দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম গাড়ি থামিয়ে একটু মালিক ভাইয়ের খোঁজ নিয়েই যায়। অগত্যা তার অফিসে গিয়ে মালিক ভাই, মালেক ভাই বলে জোরে জোরে ডাকতে থাকি। তার অফিসের একজন আস্তে করে বললেন, মালেক ভাই নেই। মালেক ভাই কোথায় গেছেন? জিজ্ঞাসা করলাম আমি। তিনি বললেন, মালেক ভাই মারা গেছেন। প্রথমে আমি তার কথা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। পরক্ষণে তাকে আবার জিজ্ঞাসা করলাম, মালেক ভাই কোথায়? এবারও তিনি নিরুত্তাপভাবে উত্তর দিলেন, তিনি মারা গেছেন। আমি অনেকক্ষণ পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে আমার পা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। তখনই মালেক ভাইয়ের সে কথাটি মনে পড়ল, আরেকটু বয়স হোক তখন নামাজ পড়ব। অথচ তিন মাসও তখন অতিবাহিত হয়নি। সকাল সকাল ঘুম থেকে তাকে আর উঠতে হবে না। তিনি একেবারের জন্যই ঘুম দিয়েছেন। যে ঘুম থেকে আর উঠা যায় না। সিদ্ধেশ্বরীতে তার পুরোনো বাড়িটি ভেঙে বিশাল ইমারত তৈরি করেছেন তিনি। শান্তিনগর মোড়ে রয়েছে তার বাণিজ্যিক ভবন। কিন্তু তা ভোগ করার জন্য এখন আর মালেক ভাই এ জগতে নেই। তাই আমরা মৃত্যুর দুয়ার খুলে রেখে কতই না মহা অট্টালিকা গড়ে তুলছি। সে অট্টালিকায় থাকতে পারব কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক/
.jpg)
.jpg)