গাছ মানুষের জন্য অপরিহার্য। কারণ, এটি অক্সিজেন সরবরাহ করে, বাতাস পরিষ্কার রাখে, কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং বৃষ্টিপাত বাড়াতে সাহায্য করে। এ ছাড়াও বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে এবং কাঠ, ফল, ফুল, ঔষধি ও খাদ্য দিয়ে আমাদের প্রয়োজন মেটায়। তাই গাছ বাঁচলেই মানুষ বাঁচবে, গাছ বাঁচলেই বাঁচবে পরিবেশ। কিন্তু কিছু গাছ আছে, যা মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অনেকের মৃত্যুর কারণও হয়েছে এসব বিষাক্ত গাছপালা। এ রকম ৬টি বিষাক্ত গাছ সম্পর্কে কথা বলব এ লেখায়।

১. ওলেন্ডার: বিশ্বব্যাপী এটি সবচেয়ে বিষাক্ত উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম নেরিয়াম ওলেন্ডার। গাছটির মূল থেকে পাপড়ি পর্যন্ত বিষাক্ত রসে ভরপুর। এই গাছে আছে ওলেন্ড্রিন নামক বিষ। এর প্রভাবে যেকোনো শক্তিশালী মানুষেরও বমি হতে পারে, হৃৎস্পন্দন অনিয়ন্ত্রিতভাবে ওঠানামা করার কারণে মৃত্যুও হতে পারে। এর একটিমাত্র পাতাই একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এমনকি এর ফুল থেকে তৈরি মধুও মানুষকে অসুস্থ করতে পারে। ইউরেশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা এদের মূল জন্মস্থান।

২. ওয়াটার হেমলক: বিশ্বের সবচেয়ে বিষাক্ত গাছগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে ওয়াটার হেমলক। এর সুন্দর ফুল দেখে যে কেউ প্রেমে পড়ে যেতে পারে। চকচক করলেই যেমন সোনা হয় না, ঠিক তেমনি ওয়াটার হেমলকের ফুল দেখে বিমোহিত হলেই করবেন মস্তবড় ভুল। কারণ ওয়াটার হেমলকের প্রতিটি অংশে সিকুটক্সিন নামক বিষ থাকে। এই বিষের প্রভাবে খিঁচুনি হওয়া, পেশির কম্পন, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। সবচেয়ে বেশি বিষ থাকে এর শিকড়ে। ওয়াটার হেমলকের বৈজ্ঞানিক নাম সিকুটা ম্যাকুলাটা। এই গাছের দেখা পাওয়া যায় উত্তর আমেরিকায়।

৩. রক্তকুচ বা রোজারি মটর: এ উদ্ভিদের তিন মাইক্রোগ্রামের চেয়েও কম বিষ মৃত্যু ঘটাতে পারে। এই ফলে থাকে অ্যাব্রিন বিষ। রিসিনের চেয়েও মারাত্মক এই বিষ। তবে সৌভাগ্যের ব্যাপার, এই বিষ শুধু বীজের খোলসের ভেতরে থাকে। বীজ ভেঙে গেলে তবেই অ্যাব্রিন বের হয়। বীজ না ভেঙে গিলে ফেললেও তেমন ভয়ের কিছু নেই। কারণ রক্তকুচ বীজের দেহাবরণ বা খোলস খুব শক্ত। এর বৈজ্ঞানিক নাম অ্যাবরুস প্রিস্যাটোরিয়াস। বাংলাদেশেও এই গাছ দেখতে পাওয়া যায়। আগে স্বর্ণকাররা সোনা মাপার বাটখারা হিসেবে ব্যবহার করত রক্তকুচের বীজ। রক্তকুচের মূল জন্মস্থান এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া।

৪. ভেন্না: রেড়ি বা ভেন্নার বীজ থেকে তেল তৈরি হলেও, এর কাঁচা বীজে রয়েছে মারাত্মক বিষ রিসিন। এটি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের জন্যই প্রাণঘাতী হতে পারে। রিসিন মানুষের শরীরে প্রোটিন উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায়। যার ফলে বমি, ডায়রিয়া, খিঁচুনি, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
ভেন্নার তেল খাদ্য ও ওষুধের পাশাপাশি এটি সৌন্দর্যবর্ধক তেল হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। পূর্ব আফ্রিকায় পাওয়া যায় ভেন্না বা রেড়ি গাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম রিসিনাস কমিউনিস।

৫. সুইসাইড ট্রি: নামেই কেমন একটা মৃত্যু-ভয়। বৈজ্ঞানিক নাম সেরবেরা ওডোলাম। গাছটি দেখতে আর পাঁচটা সাধারণ গাছের মতোই। তবে এর ক্ষতিকর ফলের কারণে গাছটির নাম দেওয়া হয়েছে সুইসাইড ট্রি। এই ফলের বীজে আছে শক্তিশালী কার্ডিয়াক গ্লাইকোসাইড। একে বলা হয় সারবেরিন। কার্ডিয়াক গ্লাইকোসাইড এক ধরনের জৈব যৌগ, যা হৃৎপিণ্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই গাছের বীজ হৃৎপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণের হার কমিয়ে দেয়। ফলে মানুষের মৃত্যুও হতে পারে। এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় এই ভয়ংকর গাছের দেখা পাওয়া যায়।

৬. ধুতুরা: এটি বাংলাদেশের একটি পরিচিত উদ্ভিদ। গ্রামবাংলার পথের ধারে, বনের ঝোপঝাড়ে অনাদরে-অবহেলায় এ গাছ বেড়ে ওঠে। মধ্য আমেরিকায় এদের দেখতে পাওয়া যায়। আমেরিকায় এই গাছ জিমসন নামে পরিচিত। একে মৃত্যুর ফাঁদ বলা হয় সেখানে। এটি নাইটশেড পরিবারের একটি উদ্ভিদ। ধুতুরা ফুল খেলে শরীরে খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। মাত্র কয়েকটি ফুলই আপনাকে কোমায় পাঠানোর জন্য যথেষ্ট। এই ফুলে আছে অ্যালকালয়েড নামক বিষ। এতে হ্যালুসিনেশনের সৃষ্টি হতে পারে। ধুতুরা ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম ডাতুরা স্ট্রামোনিয়াম।
তারেক/
.jpg)
.jpg)