সবুজ ফসলের মাঠ। মেঠোপথের নীরবতা আর পাখির কিচিরমিচির। রাজধানীর কোলাহলের ভেতরও যেন ভিন্ন এক আবহ। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) তাই শুধু উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা এক ‘শহুরে গ্রাম’।
আজ ১১ সেপ্টেম্বর। শেকৃবির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এই দিনেই বিশ্ববিদ্যালয় মর্যাদা পেয়েছিল দেশের এই প্রাচীনতম কৃষি শিক্ষার বিদ্যাপীঠ। প্রতিষ্ঠার ৮৭ বছর পরও এখানকার শিক্ষার আলো আর গবেষণার দিগন্ত সম্প্রসারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হওয়ার ২৪ বছরে কৃষি উন্নয়ন, গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে শেকৃবির অবদান অনন্য।
১৯৩৮ থেকে আজকের বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ঢাকার শেরেবাংলা নগরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘দি বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’। সময়ের ধারায় এর নাম পাল্টে হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান কৃষি ইনস্টিটিউট’ এবং স্বাধীনতার পর ‘বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট’। অবশেষে ২০০১ সালের ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনের মাধ্যমে এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
সবুজের আঙিনায় শিক্ষা-গবেষণা
বিশ্ববিদ্যালয়টিতে চারটি প্রধান অনুষদ- কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও পশুপালন, মৎস্য ও সামুদ্রিক বিজ্ঞান, কৃষি ব্যবসা ব্যবস্থাপনা এবং একটি স্বতন্ত্র সিড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট শিক্ষার্থীদের বিস্তৃত শিক্ষার সুযোগ দিচ্ছে। এখানে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে সাড়ে চার হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।
স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা- কৃষি অনুষদে ১ হাজার ৫০৭ জন, কৃষি ব্যবসা ব্যবস্থাপনা অনুষদে ২৭৫, ভেটেরিনারি ও প্রাণিসম্পদ অনুষদে ২৬৬ ও ফিশারিজ অনুষদে ৮২ জন। পিএইচডি প্রোগ্রামে রয়েছেন ১৩২ জন। শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ না থেকে গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত; নির্দিষ্ট একটি গবেষণার থিসিস ও ডিফেন্স সম্পন্ন করতে হয়। যেখানে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ থেকে ল্যাব বিশ্লেষণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হয়। এই গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও প্রযুক্তি কৃষি খাতে সমস্যা সমাধান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং টেকসই কৃষিব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
গবেষণার উজ্জ্বল ধারা
বিশ্ববিদ্যালয়টির দীর্ঘ পথচলায় দেশের কৃষিতে এসেছে অনেক সাফল্য। ক্যানসার প্রতিরোধী সবজি সাউ টমাটিলো-১ ও সাউ টমাটিলো-২; সরিষার উন্নত জাত সাউ সরিষা-১, সাউ সরিষা-২ ও সাউ সরিষা-৩; ভুট্টার উচ্চফলনশীল জাত সাউ হাইব্রিড ভুট্টা-১ ও সাউ হাইব্রিড ভুট্টা-২; ভিনদেশি ফুলের পরিবেশসহিষ্ণু নতুন জাত বঙ্গবন্ধু-১ ও বঙ্গবন্ধু-২; একই গাছে আলু ও টমেটোর জাত পমেটো; ভিনদেশি সবজি ব্রাসেলস স্প্রাউট, সলুক, উন্নত পানের জাত নির্বাচন, রসুনের বিকল্প বিডি নিরা উদ্ভাবন, প্রাণিদেহে অনুজীবঘটিত রোগবিষয়ক সফল গবেষণা, ডিএনএ বার কোডিংয়ের মাধ্যমে সামুদ্রিক জলরাশিতে নতুন নতুন মাছের প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণাকে বেগবান করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কিছু বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট ও গবেষণাগার।
আবাসন, গ্রন্থাগার ও সুযোগ-সুবিধা
বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়েছে শতভাগ আবাসন সুবিধা। ছেলেদের চারটি ও মেয়েদের তিনটি মিলিয়ে মোট সাতটি হল। আছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ছয়তলা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, যেখানে ২০০ শিক্ষার্থী একসঙ্গে পড়াশোনার সুযোগ পান। মাঠপর্যায়ের হাতে-কলমে কাজ থেকে শুরু করে ল্যাবরেটরি গবেষণা- শিক্ষার্থীরা এখানে শেখেন বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে জ্ঞান প্রয়োগ করতে।
সামাজিক দায়বদ্ধতায় শেকৃবি
শুধু শিক্ষায় নয়, বিশ্ববিদ্যালয়টি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাও পালন করে আসছে দীর্ঘদিন। মাঠ দিবস আয়োজন, বীজ ও চারা বিতরণ, ভেটেরিনারি টিচিং হসপিটাল, দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়তা সবখানেই রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির সক্রিয় ভূমিকা। ক্যাম্পাসের শিক্ষকরা ব্যক্তিগত উদ্যোগেও কৃষি সচেতনতা ছড়িয়ে দিচ্ছেন, কখনো ছাদবাগান, কখনো বিনামূল্যে চারা বিতরণের মাধ্যমে। রাজধানীর ব্যস্ততায় অনেকেই খুঁজে পান না নিশ্বাস ফেলার জায়গা। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টি এখনো ধরে রেখেছে সবুজের সজীবতা। এ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু কৃষি শিক্ষার অগ্রদূত নয়, এটি বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং টেকসই কৃষিব্যবস্থার জন্য এক আলোকবর্তিকা।