নরসিংদীসহ সারাদেশে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনাসমূহের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে চাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
মানববন্ধনে চাকসু দপ্তর সম্পাদক জান্নাতুল নুসরাত আদন বলেন, ‘আমি যখন এখানে আসছিলাম, তখন আরেকটি খবর সামনে এল: পাবনায় দাদিকে হত্যা করে নাতনিকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনা। আমরা এমন একটি সময়ে দাঁড়িয়েছি, প্রতিদিনই কোন না কোন নতুন ধর্ষণের খবর সামনে আসছে। হুমায়ূন আহমেদের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে: 'পৃথিবীর সবচাইতে ভারী বস্তু পিতার কাধে সন্তানের লাশ।' আমি সেই পিতার কথা ভাবছি, যে পিতা তার কন্যা সন্তান ধর্ষিত হওয়ার পর স্থানীয় প্রতিনিধিদের কাছে যায়; তারপর বিচার তো পান না, উল্টো বলা হয় এই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য। যখন সেই পিতা তার সন্তানের নিরাপত্তার জন্য খালার বাসায় রেখে আসতে যান, সামনে থেকেই তার সন্তানকে তুলে নিয়ে আবার ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। আমি সেই পিতার কথা ভাবছি, যার কন্যা ধর্ষিত হওয়ার পর মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয় না, তখন তিনি আত্মহত্যা করেন। আমি যে ঘটনাগুলো বললাম, এই ঘটনাগুলো গত এক সপ্তাহের। খুব বেশিদিন আগের ঘটনা না। আমরা দেখি যখন কোন ধর্ষণ কাণ্ড ঘটে আমরা সবাই তার প্রতিবাদ জানাই। আমি এখন পর্যন্ত কোন ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি লক্ষ্য করিনি।’ এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রীর নিকট ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
চাকসু ছাত্রী কল্যাণ সম্পাদক নাহিমা আক্তার দিপা বলেন, ‘ধর্ষিতদের ছবিগুলো অনেক জায়গায় ভাইরাল হচ্ছে, অন্যদিকে ধর্ষকদের ছবি কিছু মিডিয়ায় দেখা যায় আবার কিছু মিডিয়ায় দেখা যায় না। কিন্তু আমি আমার জীবনে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এদেশে কখনোই দেখিনি। এই জিনিসটা এত বেড়ে যাচ্ছে, তারপরেও আমাদের রাষ্ট্র চুপ রয়েছে। যে ধর্ষক, সে কোন দলের প্রতিনিধিত্ব করছে কিনা সেটা দেখার কথা নয়; যে ধর্ষক, সে একজন অপরাধী। দলীয় পরিচয় দেখে তাকে আমরা আশ্রয় দেব, তা কখনো হতে পারে না। কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত সেই দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি, স্বৈরাচারীর আমলেও দেখেছি। যখন আমরা নতুন একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখছি, সেখানেও আমরা যাদেরকে প্রতিনিধি হিসেবে পেয়েছি, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছি, তাদের কোন পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত দেখি না।’
চাকসু যোগাযোগ ও আবাসন সম্পাদক ইসহাক ভূঁইয়া বলেন, ‘শুধু নরসিংদীর এই ঘটনা নয়, বিগত ফ্যাসিবাদী আমলেও ধর্ষণ, খুন, ছিনতাই, রাহাজানি ইত্যাদি কর্মকাণ্ড ছিল বিচারের ঊর্ধ্বে। সেই ফ্যাসিবাদী সরকারকে আমরা ২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পালাতে বাধ্য করেছি। আমাদের আশা ছিল ফ্যাসিবাদী সরকারের বিতাড়িত হওয়ার পর বাংলাদেশে একটি সাম্য, ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে আমাদের বোনেরা নিরাপদে রাতের আঁধারেও চলাফেরা করতে পারবে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আমরা এখনো পর্যন্ত নিরাপদ নই। শুধু নিরাপত্তাহীনতায় নয়, যাদের কাছে আমরা নিরাপত্তা পাবো বলে আশা করেছিলাম, তাদের কাছে আমরা নিরাপদ নই। তাদের দ্বারাই আমাদের বোনেরা নির্যাতিত হচ্ছে, তাদের দ্বারাই আমাদের মায়েরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড যদি প্রকাশ্যে কার্যকর করা হয়, তবেই আমরা ধর্ষণ কাণ্ড বন্ধ করতে পারব।’
চাকসু সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সাইদ বিন হাবিব বলেন, ‘খুবই দুঃখজনক একটি বিষয় নিয়ে আমরা আজকের মানববন্ধনে প্রতিবাদ করতে এসেছি। সেটি হচ্ছে ধর্ষণের মতো ইস্যু। গোটা বাংলাদেশে যখন রমজানের পবিত্রতার ছোঁয়া, সবাই ইবাদতে মগ্ন থাকার কথা, তখনও একদল গোষ্ঠী আমাদের প্রতি হামলা, সহিংসতা ও ধর্ষণের মত কার্যক্রমে লিপ্ত। কেবলমাত্র নরসিংদী নয়, পূর্বেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। আমরা ফ্যাসিবাদী আমলে দেখেছিলাম ধানের শীষে ভোট দেওয়ার অপরাধে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়, কিন্তু ইন্টারিম সরকারের সময়ও শাপলা চত্বরে ভোটের অপরাধে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে। নতুন বাংলাদেশে যারা গণতন্ত্রের ছবি দেয়, তাদের মধ্যে বিএনপির নেতাকর্মীরাও এই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত।’
মানববন্ধনে আরও উপস্থিত ছিলেন- চাকসু আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক ফজলে রাব্বী তৌহিদ, দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ও আন্তর্জাতিক সম্পাদক সোহানুর রহমান সোহানসহ অন্যান্য নেতারা।
আল আরাফ/রিফাত/




