নারীর জীবন একসঙ্গে নানা দায়িত্ব ও প্রত্যাশায় আবদ্ধ। সংসার, সন্তান, কর্মক্ষেত্র, আত্মীয়স্বজন সবকিছু সামলাতে গিয়ে অনেক নারী নিজেকে শেষ পর্যন্ত ভুলে যান। এ ব্যস্ততা ও চাপে যা অদৃশ্যভাবে জমতে থাকে তা হলো স্ট্রেস বা মানসিক চাপ। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রেস নারীদের ওপর পুরুষের তুলনায় ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। এটি শুধু তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে নয়, শারীরিক দিকেও গুরুতর প্রভাব রেখে যায়। তাই বিষয়টি বোঝা এবং সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মানসিক চাপ আসলে আমাদের শরীর ও মনের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। যেকোনো চাপ বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে শরীর কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন নামের হরমোন নিঃসরণ করে। এগুলো স্বল্প সময়ে মনোযোগ ও শক্তি বাড়ায়। কিন্তু যখন এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখনই সমস্যা শুরু হয়। তখন এটি মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি বা হজমের গোলযোগ থেকে শুরু করে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, এমনকি বিষণ্নতা পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।
২০২৩ সালের আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (APA) এক জরিপে দেখা গেছে, নারীরা গড়ে পুরুষদের চেয়ে বেশি চাপ অনুভব করেন। আর্থিক চিন্তা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সম্পর্কজনিত টানাপোড়েন তাদের মানসিক চাপের প্রধান উৎস। এ ছাড়া মানসিক সমর্থনের অভাবে তারা বেশি চাপ অনুভব করেন বলেও জানা যায়। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, নারীরা পুরুষের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি মানসিক চাপে ভোগেন। অর্থাৎ বিষয়টি শুধুই ধারণা নয়, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে নারীরা অধিক চাপের মুখোমুখি হন।
নারীর জীবনে মানসিক চাপের উৎস বহু রকম। পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়া, কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় কাজ করা, আর্থিক সংকট, পড়াশোনা বা সামাজিক প্রত্যাশা, সব মিলে তারা প্রায়শই নিজেদের যত্ন নেওয়ার সময় পান না। বিশেষ করে আমাদের সমাজে নারীকে ‘সব সামলাতে হবে’ বলে এক ধরনের চাপ তৈরি করা হয়। অনেক সময় তারা জানেনও না যে, তাদের শরীর-মন কতটা ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। এভাবেই ধীরে ধীরে মানসিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয় এবং স্বাভাবিক জীবনের অংশ মনে হতে শুরু করে।
মানসিক চাপের প্রভাব শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি দিকেই দেখা যায়। শারীরিকভাবে নারীরা মাথাব্যথা, ঘাড় বা পিঠে ব্যথা, হজমের গোলযোগ, ক্লান্তি এবং ঘুমের অভাবের শিকার হন। মানসিকভাবে উদ্বেগ, হতাশা, রাগ, বিরক্তি ও মুড সুইং দেখা দেয়। এতে মনোযোগ ধরে রাখা বা সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক নারী সামাজিকভাবে একাকিত্ব অনুভব করেন, পরিবার বা দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়।
এ চাপ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে বিপদ আরও বাড়ে। গবেষণা বলছে, নারীরা পুরুষের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি বিষণ্নতা ও উদ্বেগে আক্রান্ত হন। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, মাইগ্রেন, ওজন বৃদ্ধি, এমনকি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৯) অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের প্রায় ১৯ শতাংশ চিকিৎসাযোগ্য মানসিক সমস্যায় ভোগেন, যার অন্যতম কারণ দীর্ঘস্থায়ী চাপ। বিশেষত শহর ও গ্রামীণ সমাজে পরিবার ও গৃহস্থালি দায়িত্বের ভারে অনেক নারী চুপচাপ এ চাপ বহন করেন।
চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব, তবে তার জন্য সচেতনতা ও কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রথমত, নিজের সীমা চিহ্নিত করা এবং সবকিছুর দায়িত্ব একা কাঁধে না নেওয়া। প্রয়োজন হলে ‘না’ বলতে শিখতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা দরকার। প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা হাঁটা বা ব্যায়াম শরীর ও মনের চাপ কমাতে কার্যকর। যোগব্যায়াম, ধ্যান বা গভীর শ্বাস নেওয়ার অভ্যাসও অনেক উপকারী।
এ ছাড়া নিজের জন্য সময় বের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গান শোনা, বই পড়া, বাগান করা বা যেকোনো প্রিয় কাজ মনের চাপ কমায়। বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলাও মানসিক শান্তি আনে। অনেক নারী সবকিছু নিজের মধ্যে চেপে রাখেন, যা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নিতে দ্বিধা করবেন না। থেরাপি বা কাউন্সেলিং অনেক ক্ষেত্রেই জীবন বাঁচাতে পারে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো ডিজিটাল চাপ। সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় কাটানো বা অনবরত খারাপ খবর দেখা মানসিক চাপ বাড়ায়। তাই মাঝে মাঝে ডিজিটাল ডিটক্স অর্থাৎ মোবাইল ও ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকলে স্ট্রেস কমতে পারে। একইভাবে নিজের জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে ভাবা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে মন হালকা হয়।
সবশেষে বলা যায়, নারীদের জীবনে স্ট্রেস একটি বাস্তবতা। তাই সচেতনতা, সঠিক জীবনযাপন, মানসিক সমর্থন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ এসবের সমন্বয়েই চাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সমাজকেও বুঝতে হবে যে নারীরা শুধু দায়িত্বের বোঝা বইবার জন্য নন; তাদেরও বিশ্রাম, সমর্থন ও ভালো থাকার অধিকার আছে। স্ট্রেস যেন নীরব ঘাতক না হয়ে ওঠে, সে জন্য প্রতিটি নারীকে নিজের যত্ন নিতে হবে এবং আশপাশের মানুষকেও সহযোগিতা করতে হবে।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA)
/এসএল
.jpg)