নীরব চোখের ভাষা ভেঙে নারীদের প্রতিদিনের অদৃশ্য যন্ত্রণাকে পর্দায় তুলে এনেছেন তানহা তাবাসসুম। আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘হোয়াট ইফ’ চলচ্চিত্রটি এক তরুণ নির্মাতার সাহসী প্রতিবাদী কণ্ঠ। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন এস লুপিন
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে বাংলাদেশের এক তরুণ নারী নির্মাতার প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র যখন সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়—একটি প্রজন্মের অনুভবের ভাষা হয়ে ওঠে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী তানহা তাবাসসুমের নির্মিত ‘হোয়াট ইফ’ ঠিক তেমনই একটি চলচ্চিত্র, যা নারীদের প্রতিদিনের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য হ্যারাসমেন্টের অভিজ্ঞতাকে নীরব কিন্তু শক্তিশালী ভাষায় তুলে ধরেছে।
তানহা নিজেকে খুব সাধারণ একজন মেয়ে বলেই পরিচয় দেন। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিদিনের যাতায়াত, বাসে ওঠানামা, রাস্তায় হাঁটা—এই চেনা অভিজ্ঞতার মধ্যেই তিনি দেখেছেন এমন অনেক দৃশ্য, যা আমাদের সমাজে প্রায় ‘স্বাভাবিক’ বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালে যে অস্বস্তি, ভয় আর অপমান লুকিয়ে থাকে, ‘হোয়াট ইফ’ সেই জায়গাতেই আলো ফেলেছে।
তানহার জন্য এ চলচ্চিত্রটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তার বানানো প্রথম শর্ট ফিল্ম। আর প্রথম কাজেই আন্তর্জাতিক পুরস্কার—এটি তার কাছে ছিল আনন্দের পাশাপাশি এক ধরনের বিস্ময়ও। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে, সীমিত অভিজ্ঞতা ও সামান্য বাজেট নিয়ে কাজ করে এমন স্বীকৃতি পাওয়া তাকে নতুন করে সাহস জুগিয়েছে।
‘হোয়াট ইফ’ এর ভাবনা এসেছে তানহার নিজের জীবন থেকে। নিয়মিত পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াত করতে গিয়ে তিনি যেমন নিজে নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, তেমনি আশপাশের বন্ধুদের অভিজ্ঞতাও তার ভাবনাকে তীব্র করেছে। বাসে, রাস্তায় কিংবা ভিড়ের মধ্যে মেয়েদের দিকে তাকানোর ভঙ্গি, অপ্রয়োজনীয় দৃষ্টি, অস্বস্তিকর নীরবতা—এসবই তার চলচ্চিত্রের মূল অনুপ্রেরণা। তিনি বলেন, নারীদের হ্যারাসমেন্ট শুধু শারীরিক স্পর্শেই সীমাবদ্ধ নয়; অনেক সময় চোখের ভাষাই সবচেয়ে বেশি আঘাত করে।’
চলচ্চিত্রে তিনি যাকে ‘নীরব হ্যারাসমেন্ট’ বলেছেন, তা মূলত সেই অভিজ্ঞতাগুলো—যেগুলো নিয়ে আমরা কথা বলি না, অথচ প্রতিদিন সহ্য করি। রাস্তায় হাঁটার সময় অপরিচিত মানুষের বিশ্রী দৃষ্টি, বাসে বসে থাকা অবস্থায় অস্বস্তিকর তাকানো—এসব ঘটনা একেকটি মেয়ের মনে গভীর ছাপ ফেলে। ‘হোয়াট ইফ’-এ তানহা রঙের ব্যবহার দিয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে এসব অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে একটি মেয়ের রঙিন জীবনকে রংহীন করে তোলে।
তানহা জানান, এই চলচ্চিত্র নির্মাণের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বাস্তব লোকেশন ও মানুষ ম্যানেজ করা। বাসে শুটিং করার সময় টিম ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন সাধারণ যাত্রী। তাদের প্রতিক্রিয়া, বিরক্তি কিংবা সম্ভাব্য ঝামেলা—সবকিছু সামলানোই ছিল বড় পরীক্ষা। তবু সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তিনি কাজটি শেষ করতে পেরেছেন।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘হোয়াট ইফ’ প্রদর্শনের পর দর্শক ও জুরিদের প্রতিক্রিয়া তানহাকে নতুনভাবে ভাবিয়েছে। প্রথম কাজ হয়েও যে এত প্রশংসা পেয়েছেন, সেটি তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। বিদেশি দর্শকরাও এই গল্পের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পেয়েছেন। তানহার মতে, দেশ ভিন্ন হতে পারে, পরিবেশ আলাদা হতে পারে, কিন্তু নারীদের অভিজ্ঞতা অনেকটাই এক—হ্যারাসমেন্টের ভাষা বিশ্বজনীন।
তানহা বিশ্বাস করেন, সমাজে যেসব বিষয়কে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়া হয়, সেগুলো কখনোই মেনে নেওয়ার মতো নয়। সিনেমার মাধ্যমেই তিনি সেই স্বাভাবিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেয়েছেন। তার চলচ্চিত্র কোনো উচ্চৈঃস্বরে বক্তব্য নয়; বরং নীরবতার মধ্যেই প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে নিয়েছে।
এই কাজের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নারীদের পক্ষ থেকে তার বার্তা স্পষ্ট—নীরব থাকা কোনো সমাধান নয়। যারা প্রতিদিন নানাভাবে হ্যারাসমেন্টের শিকার হন, তাদের উদ্দেশে তানহার ব্যক্তিগত আহ্বান, সেই মুহূর্তেই প্রতিবাদ করা, যতটা সম্ভব নিজের অবস্থান জানান দেওয়া।
এই সাফল্যের পর তানহা নিজেকে কেবল একজন শিক্ষার্থী বা নির্মাতা হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। তিনি নিজেকে দেখতে চান একজন প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে—যে ক্যামেরার মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবে। ‘হোয়াট ইফ’ তার সেই যাত্রার প্রথম ধাপ, যা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে—নীরব চোখের ভাষাও বদলে দিতে পারে অনেক কিছু।
/এসএল
.jpg)