নারায়ণগঞ্জ সদর জেনারেল হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি থেকেও রোগীরা সরকারি খাবার পাচ্ছেন না। অথচ কর্তৃপক্ষ নিয়মিত খাবারের বিল পরিশোধ করছে। রোগীরা বলছেন, ভর্তি হওয়ার পর তাদের শুধু স্যালাইন দেওয়া হয়। এ ছাড়া তারা কিছুই পান না। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের হিসাব রক্ষক, ক্যাশিয়ার ও সরবরাহকারী আতাত করে রোগীদের খাবারের টাকা আত্মসাৎ করছেন। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন থেকে যথাযত নিয়মে খাবার সরবরাহ করা হবে।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সদর জেনারেল হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৯০ জন রোগী ভর্তি হয়। এটি জেলার একমাত্র ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসালয়। তবে এ ওয়ার্ডে শয্যার সংখ্যা মাত্র ১০টি। ফলে পর্যায়ক্রমে রোগীরা সেবা পেয়ে থাকেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শয্যা অনুসারে প্রতিদিন এখানে ১০ জন রোগীর খাবার বরাদ্দ দেয়। তবে খাবার তো দূরের কথা রোগীদের এখানে পানিও বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। খাবার নিয়ে সমস্যা শুধু সদর হাসপাতালেই নয়, নগরীর খানপুরের ৩০০ শয্যার হাসপাতালের রান্নাঘর থেকে খাবার ও কাঁচামাল চুরির অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগী মোতালেব মিয়া বলেন, ‘শনিবার ভোরে অসুস্থ অবস্থায় এখানে ভর্তি হই। এরপর নার্সরা একটি স্যালাইন দেন। বাকি সব বাইরে থেকে কিনে এনেছি। বেলা ১১টা পর্যন্ত কোনো খাবার পাইনি। পানি পর্যন্ত বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে।’
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশু নুর মোহাম্মদের নানা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আজকে নাতিকে ভর্তি করেছি। এর আগে আমিও ভর্তি ছিলাম। কিন্তু কখনো হাসপাতাল থেকে খাবার দেয়নি। এখানে স্যালাইন ছাড়া আর কিছু দেয় না। নার্সরা শুধু সেবা দেন আর চিকিৎসা দেন জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা।’
এখানে এক বেডে দুজন রোগীকে একসঙ্গে রাখা হয় বলে জানান ফরিদা বেগম নামে আরেক রোগী। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের এ ওয়ার্ডে স্যালাইন ছাড়া কোনো ওষুধ দেয় না। আবার রোগী বেশি হলে এক বেডে দুজনকে থাকতে হয়। এ ছাড়া আশপাশ থেকে আবর্জনার দুর্গন্ধ বের হয়। এ সমস্যা দীর্ঘদিনের। অথচ সব দেখেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয় না।’
সদর হাসপাতালের হিসাব বিভাগে গিয়ে জানা যায়, প্রতিদিন একজন রোগীর জন্য বরাদ্দকৃত খাবারে দাম ১৭৫ টাকা। সে হিসাবে মাসে ৫২ হাজার ৫০০ টাকা আর বছরে ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ হয় শুধু ডায়রিয়া ওয়ার্ডের ১০ শয্যা থেকে। মূলত হাসপাতালের হিসাব রক্ষক আলাউদ্দিন ও ক্যাশিয়ার নুরুল আমিনের সঙ্গে আতাত করে খাবার সরবরাহকারীরা দীর্ঘদিন ধরে এই টাকা আত্মসাৎ করে আসছেন বলে জানায় হাসপাতালের কর্মচারীরা। আর খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নোভা ট্রেডার্সের মালিক হাবিবুর রহমান হলেও এর দেখভাল করেন আরমান নামে অন্য একজন। তিনি সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে শহরে পরিচিত।
রোগীর খাবার নিয়ে অনিয়মের বিষয়ে সরবরাহকারী আরমানের ঠিকানায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি, মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি। এ ছাড়া হিসাব রক্ষক আলাউদ্দিন বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। আর ক্যাশিয়ার নুরুল আমিন ওমরা হজ করতে গেছেন। তাই অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা যায়নি।
সরকারি হাসপাতালে রোগীদের খাবার নিয়ে অনিয়ম, ব্যাগ ভরে খাবার নিয়ে যাওয়া চরম অপরাধ বলে জানান জেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ বি সিদ্দিক। তিনি উল্লেখ করেন, এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) জহিরুল ইসলাম জানান, তিনি নতুন যোগদান করেছেন। তাই বিষয়টি তিনি জানেন না। তবে এখন থেকে যথাযত নিয়মে খাবার সরবরাহ ও বিতরণ কার্যক্রম মনিটরিং করবেন বলে জানান তিনি।
এদিকে খাবার নিয়ে অনিয়মের সুযোগ নেই জানিয়ে সিভিল সার্জন মুশিয়ার রহমান বলেন, ‘ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগীরা বেশি সময় থাকেন না, তাই এ ওয়ার্ডের খাবার অন্য ওয়ার্ডে দিয়ে দেওয়া হতে পারে। তারপরও যদি অনিয়ম হয়ে থাকে, তা হলে খতিয়ে দেখা হবে কারা তা করছেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালের রান্নাঘর থেকে খাবার চুরির ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। হাসপাতালের সিসি ক্যামেরাতে তা ধারণ করা হয়। তবু কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয় না। জানতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি এড়িয়ে যায়।