ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে নারী চিকিৎসককে বিয়ে করেও স্ত্রীর মর্যাদা দিচ্ছেন না ফারহান তানভীর (৩৩) নামের আরেক চিকিৎসক। পরিশেষে সেই চিকিৎসকের বাসার সামনে স্ত্রীর মর্যাদার দাবিতে প্লেকার্ড হাতে দাঁড়িয়েও অন্তঃসত্ত্বা নারী চিকিৎসক পাননি কোনো সুরাহা।
বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৫টায় newshour24bd নামে একটি ফেসবুক পেজে এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হতে দেখা যায়। ভিডিওতে ভুক্তভোগী এক নারী চিকিৎসককে দেখা যায় প্লেকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছেন স্ত্রীর মর্যাদার দাবিতে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টায় ফরিদপুর জেলা শহরের ঝিলটুলি এলাকার অসিত্ত্ব টাওয়ারের সামনে প্লেকার্ড হাতে এক নারী চিকিৎসক স্ত্রীর মর্যাদার দাবিতে ২০ থেকে ২৫ মিনিট একা দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্লেকার্ডটি ডাক্তার ডা. ফারহান তানভীর নামের এক চিকিৎসকের ছবি সম্বলিত, নিচে লেখা ছিল ‘আমার স্বামী, আমি আমার ন্যায্য অধিকার চাই, স্ত্রী হিসাবে মর্যাদা চাই।’
বিয়ের ৭ দিন পরেই নারী চিকিৎসকের এমন দাবির বিষয়ে জানা যায়, ডাক্তার ফারহান তানভীরের সঙ্গে গত বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে ফেসবুকে পরিচয় হয় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নারী চিকিৎসকের। আর সেই সূত্র ধরে তারা দুজন মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলতে থাকে। অতঃপর দীর্ঘ ৫ মাসে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। এরপর বিয়ের আশ্বাস দেওয়া হলে ঘটনাটি গড়ায় শারীরিক সম্পর্কে। এরই মধ্যে চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি নিজেদের মধ্যে আরও ভালো সম্পর্ক এবং দুজনকে ভালোভাবে চেনা ও বুঝার জন্য চিকিৎসক এস এম ফারহান তানভীর কক্সবাজার নিয়ে যান ওই নারী চিকিৎসককে। সেখানের একটি হোটেল তিন রাত তিনদিন বিশেষ মুহুর্ত পার করেন দুজনে। এরপর অন্তঃসত্তা হন ওই নারী চিকিৎসক। এরপর ডাক্তার ফারহান তানভীর ১৮ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা বাঙালিয়ানা রেস্টুরেন্টে পারিবারিকভাবে অন্তঃসত্ত্বা ওই নারী চিকিৎসককে বিয়ে করেন।
ডাক্তার এস এম ফারহান তানভীর ফরিদপুর জেলার মধুখালি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার হিসাবে কর্মরত আছেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ২০১৬ সালে এম বি বি এস পাশ করেন। ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলি এলাকার অ্যাডভোকেট মো. আক্কাস আলী মিয়ার ছেলে তিনি।
অপরদিকে ডা. ফারহান তানভীরের স্ত্রী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চিকিৎসকের বাড়ি পাবনার সাথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুর গ্রামে। তিনি বগুড়া মেডিকেল থেকে ২০১৮ তে এম বি বি এস শেষ করে এখন ঢাকা মোহাম্মদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত আছেন।
অন্তঃসত্ত্বা ওই নারী চিকিৎসক দাবি করেন, এর আগেও তার হাসব্যান্ড ডাক্তার ফারহান তানভীর ফারিন আহমেদ আনিকা নামে অন্য একজন নারী চিকিৎসকে বিয়ে করেন এবং পরবর্তী সময়ে তাকেও কোনো এক কারণে ডিভোর্স দেন। আনিকা নামের ওই চিকিৎসকের সঙ্গে ফারহান তানভীরের রেস্টুরেন্টে বসা দুটি ছবিও প্রতিবেদককে দেন ফারহান তানভীরের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা নারী চিকিৎসক।
তিনি বিয়ে এবং বিয়ে পরবর্তী সময়ে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, শহরের টেপাখোলার হোটেল বাঙালিয়ানায়তে ১৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় আমাদের বিয়ে সম্পন্ন হলেও তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে ওই বাড়িতে উঠিয়ে নেননি ফারহান তানভীরের পরিবার। বিয়ে সম্পন্ন হবার ৫ মিনিট পরেই আমি ও আমার পরিবারকে হুমকি ধামকি দেওয়া শুরু করে আমার হাজব্যান্ড ডাক্তার ফারহান ও তার পরিবার। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গসহ এনএসআই ও সাংবাদিক এনে আমাকে শাসাতে থাকে। এভাবে ঘটনাটি রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলতে থাকে এক পর্যায়ে জোরপূর্বক আমাদের একটি সিএনজিতে উঠিয়ে দেওয়া হয়। উপায় না পেয়ে আমি ও আমার পরিবার সেখান থেকে চলে আসি। এরপর ফারহান আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে ২০ তারিখ বিকেলে আমি ফারহারের ঝিলটুলির বাসায় গিয়ে শারিরীকভাবে নির্যাতনের শিকার হই এবং ৯৯৯ এ কল দেওয়াতে থানা থেকে একটা টিম গিয়ে আমাকে রেস্কিউ করে নিয়ে আসে। সেদিন আমি রাত ১১টা পর্যন্ত থানাতে অপেক্ষা করি এবং এর মাঝে হাসপাতাল থেকেও চিকিৎসা নিয়ে আসি। যার ডকুমেন্ট আমার কাছে আছে এবং থানার সিসি ক্যামেরা চেক করলে সব ঘটনা পাওয়া যাবে।
তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, এত টাইম অপেক্ষা করার পরেও থানার ওসির সঙ্গে আমি দেখা করতে পারিনি। ওসি আমার সঙ্গে দেখা না করে আমার বাবাকে কল দেন। বাবাকে আসতে বলেন থানায় মীমাংসা করার জন্য। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমার বাবা গত ২৫ তারিখ আসেন এবং আমরা থানায় যাই আনুমানিক ২টার দিকে। এক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর ওসির সঙ্গে আমার বাবা ও মামা দেখা করেন এবং তাদেরকে বলেন মীমাংসা করার কথা। তখন ওসি আমার বাবা মামাকে বলেন এই বিষয়ে তিনি আর কোনো কথা বলতে ইচ্ছুক না। মামলা করার কথা বলাতেও তিনি মামলা নিতে চান নি। এরপর আমি স্ত্রীর মর্যাদার দাবি করে ডাক্তার ফারহান তানভীরের বাড়ির সামনে প্লেকার্ড হাতে অবস্থান নিই ।
স্ত্রী মর্যাদার দাবিতে প্লেকার্ড হাতে দাঁড়ানো ভুক্তভোগী ওই নারী চিকিৎসক আরও অভিযোগ করে বলেন, ফারহানের পুরো পরিবার বিয়ের আগেই জানত আমি অন্তঃসত্তা। তারা ধর্ষণ মামলা থেকে বাঁচার জন্যই বিয়ে নামক এই নাটক এর আশ্রয় নেয় এমনকি আমার বিয়ের কাবিননামায় জালিয়াতি করেছে তারা। বিয়ের দেনমোহর ধার্য করা হয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা যার মধ্যে উসল ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার। কোনো টাকা এবং গহনা ছাড়াই ক্ষমতাবলে জোরপূর্বক কাবিননামাত উসুল দেখানো হয়।
এবিষয়ে ডাক্তার ফারহান তানভীরের সঙ্গে কথা বলতে মধুখালি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি, হাসপাতাল সূত্রে যানা যায় তিনি তিন দিনের ছুটিতে আছেন। এদিকে ডাক্তার ফারহান তানভীরের দুটি মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে অন্তঃসত্তা নারী চিকিৎসককে পুলিশের আইনি সহায়তা না দেওয়া এবং থানায় লিখিত অভিযোগ না নেওয়ার প্রসঙ্গে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদ উজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ওই মেয়ে আসে নাই আমার কাছে। আমি বরং তাদের দুই পক্ষের গার্ডিয়ানকে ফোন দিয়েছিলাম মীমাংসার জন্য।
এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মাহ্মুদুল হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত করে দেখা হবে বিষয়টি, সত্যতা পেলে অবশ্যই আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব তার বিরুদ্ধে।
সঞ্জিব দাস/মাহফুজ