রাজশাহীর চারঘাট উপজেলা ভূমি অফিস যেন অনিয়ম ও দুর্নীতির এক অভয়ারণ্য। ঘুষ ছাড়া এখানে এক ইঞ্চিও নড়ে না কোনো ফাইল, দালাল ছাড়া হয় না একটি কাজও। অভিযোগ রয়েছে, অফিসে প্রভাবশালী একাধিক দালাল চক্র সক্রিয়ভাবে ভূমিসংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে, যাদের ছত্রচ্ছায়ায় চলছে একের পর এক অনিয়ম। এতে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ পড়ছেন ভয়াবহ হয়রানির মুখে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তোভোগী অভিযোগ করে বলেন, নামজারি, মিসকেস, খতিয়ান সংশোধন কিংবা খাজনা পরিশোধ করতে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। অথচ এসব সেবা পাওয়ার কথা সরকারের নির্ধারিত ফি অনুযায়ী।
চারঘাট উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ভূমি অফিস ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি অফিসেই রয়েছে একাধিক দালাল, যারা সরকারি কর্মচারীর মতোই ঘোরাফেরা করছেন অফিস কক্ষে। একাধিক সেবাগ্রহীতা বলেন, ওদের দেখে বোঝাই যায় না- কারা আসল স্টাফ, কারা দালাল। সরকারিভাবে ফি নির্ধারিত থাকলেও এসব দালালের মাধ্যমে গোপনে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।
পঞ্চাশোর্ধ্ব মতিন মিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ৩৬ শতাংশ জমির নামজারি (নাম খারিজ) করতে মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে। ঘুষ না দেওয়ায় কাজ হচ্ছে না। নামজারি, ডিসিআর ও দাখিলার নামে এখানে অবাধে চলে ঘুষ-বাণিজ্য। এ সময় তার কথায় আওয়াজ তুলে সায় দিচ্ছিলেন নামজারি ও খাজনা দিতে আসা অন্য সেবাপ্রত্যাশীরাও।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১২ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেট অনুযায়ী, চারঘাট মৌজার ৩৬৬ নম্বর দাগে অবস্থিত শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতক জমি ‘ক’ তালিকাভুক্ত ভেস্টেড প্রপার্টি (ভিপি) হিসেবে চিহ্নিত। গেজেটের ৮৩৭৩ নম্বর পাতায় ৩৯ নম্বর ক্রমিক অনুযায়ী, এটি এসএ ৫৬৯ ও আরএস ৫৩৬ নম্বর দাগভুক্ত জমি হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। অথচ পরবর্তী সময়ে ভূমি অফিসের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তা ওই গেজেটের তথ্য গোপন করে অনলাইনে হোল্ডিং অনুমোদন দিয়ে জমিটি খাজনা গ্রহণের আওতায় আনেন। জমির দাখিলা নম্বর ৮১২৫২৪০৩৫৪১৯। এই কাগজ দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মুনজুর রহমানের বাবা আশরাফ সরকার ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অধিগ্রহণ শাখা থেকে ১১ লাখ ২১ হাজার ৯৬৫ টাকা উত্তোলন করেন (চেক নম্বর: ০৮৩২৯২৮, এল. কেস নম্বর: ০৯/২০২১-২০২২)। তবে মোবাইল ফোনে মুনজুর রহমান সাংবাদিককে জানান, ‘আমি টাকা পায়নি, আবেদন করেছি মাত্র।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলা কমিটির সভাপতি আহমেদ শফি উদ্দিন বলেন, ‘অনিয়ম-দুর্নীতির এই চিত্র শুধু একটি উপজেলায় নয়, বরং দেশের অনেকাংশেই ভূমি ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালাল চক্রের প্রভাব যে কতটা গভীরে প্রবেশ করেছে, তার একটি প্রতিচ্ছবি। প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করা গেলে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ কঠিন।’
চারঘাট ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আনন্দ কুমার বলেন, ‘জমিটি ২০২২ সাল থেকে অনলাইনে হোল্ডিংভুক্ত রয়েছে। গেজেট পরিবর্তন বা ফ্লুইড দিয়ে মুছে দেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। তবে গত ১৫ মে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ হোসেনের নির্দেশনায় হোল্ডিংটি বাতিল করা হয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’