শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিনের সঙ্গে এক নারীকে জড়িয়ে আপত্তিকর ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তিনি তার কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ভিডিও ক্লিপ ও ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর জেলা জুড়ে এ ঘটনা নিয়ে চলছে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে জেলা প্রশাসক বৃহস্পতিবার রাতে একটি ভাড়া করা গাড়িতে করে শরীয়তপুর থেকে চলে যান। তবে জেলা প্রশাসকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন তিনি ছুটিতে রয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ছবি ও ভিডিওতে থাকা নারী তার আত্মীয় হন। পরিবারে যাতায়াতের কারণে তাদের সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রকাশ পাওয়া ছবি ও ভিডিওর কিছু সত্য এবং কিছু মিথ্যা। ওই নারী গত বছর সেপ্টেম্বরে তার স্বামীকে তালাক দেন।
আশরাফ উদ্দিন দাবি করেন, আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ওই নারী ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করেন। ডিসি হিসেবে পদায়নের পর ওই নারী আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। নানাভাবে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকেন। বিভিন্ন সময় ঘুমের ওষধ ও নেশা জাতীয় দ্রব্য খাইয়ে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করে আমার ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হতো। ব্ল্যাকমেইল করে প্রতি মাসে টাকা হাতিয়ে নিত। তাকে প্রতিমাসে টাকা দিতে হতো। তাকে পূবালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা হতে তার একাউন্টে টাকাগুলো দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকবার টাকা দেওয়ার ডকুমেন্ট রয়েছে। সর্বশেষ তিনি চাপ দিতে থাকেন আমার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তাকে বিয়ে করতে হবে। নয়তো একটি বড় অংকের টাকা দিতে হবে। তার ওই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় টাঙ্গাইলের কিছু সংবাদকর্মী ও আইনজীবীদের ওই ছবি ও ভিডিও সরবরাহ করেন। এছাড়া শরীয়তপুরের এক আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে টাকা আদায় করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল ছবি জনসম্মুখে প্রকাশ করার অধিকার কেউ রাখে না। এ কারণে ওই নারীর বিরুদ্ধে আমি আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারি।
ভিডিওতে থাকা ওই নারীর বাড়ি টাঙ্গাইলে। তিনি স্বামীর সঙ্গে ঢাকার মিরপুর এলাকায় থাকতেন। আর জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিনের বাসাও মিরপুর এলাকায়। স্বামীর সঙ্গে ওই নারীর ডিভোর্স হওয়ার পর তিনি টাঙ্গাইলে বসবাস করেন।
ওই নারীর সঙ্গে কথা হয় খবরের কাগজের প্রতিবেদকের, এ সময় তিনি দাবি করেন, ‘ডিসি আশরাফ উদ্দিন আমার ননদের স্বামী ছিলেন, তাদের সংসার জীবনে সমস্যা চলছিল। সে সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি আমার বাসায় আসতেন। এর পর থেকেই তার সঙ্গে আমার কথা হতো। এর পর প্রেমের সম্পর্ক হয়। তারপর আশরাফ উদ্দিন তাকে বিয়ের কথা বলে স্বামীর সঙ্গে ডির্ভোস করিয়েছেন, সংসার ভেঙ্গেছেন। এখন বিয়ে না করে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন। ঘুমের ওষধ খেয়ে, নেশা করে, আত্মহত্যা করার ভয় দেখিয়ে তার প্রতি আমাকে দুর্বল ও আসক্ত করেন। এক বছর ধরে আমাদের সম্পর্ক চলছে। বিয়ের জন্য বললে আমার ছবি ও ভিডিও সে ভাইরাল করে দিবে এমন হুমকিও দিয়েছেন।’
দুই মাস ধরে জেলা প্রশাসক ও ওই নারীর মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছেন শরীয়তপুর জজ কোর্টের একজন আইনজীবী। তিনি বলেন, দুই জনই একজন আরেক জনের বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ করতেন। আমি দুই জনকেই প্রস্তাব দিয়েছিলাম বিয়ে করার জন্য। কিন্তু ওই নারী রাজি হননি। তিনি সমঝোতার জন্য বড় অংকের টাকা দাবি করেছিলেন। যা পরিশোধের ডেডলাইন দেওয়া হয়েছিল ৩০ জুনের মধ্যে। ওটা নিয়েই আলোচনা চলছিল। তার মধ্যেই এমন ছবি ও ভিডিও মানুষের সামনে চলে আসলো।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বছর নভেম্বর মাসে জেলা প্রশাসক হিসেবে ২৭তম বিসিএসের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিন শরীয়তপুরে যোগদান করেন। বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) গভীর রাতে আশরাফ উদ্দিনের সঙ্গে এক নারীকে জড়িয়ে একটি আপত্তিকর ভিডিও ক্লিপ ও চারটি আপত্তিকর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এরপরই ওই ভিডিও ও ছবি শরীয়তপুরের বিভিন্ন মানুষ তাদের ফেসবুকে পেজে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আশরাফ উদ্দিন ওই নারীকে উদ্দেশ্য করে আবেগঘন কিছু কথা বলছেন, এমন একটি ভিডিও শুক্রবার বিকেলে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ওই পোস্ট থেকে তাদের প্রেমের সম্পর্কের সত্যতা পাওয়া যায়।
জেলা প্রশাসকের অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মাসুদুল আলম বলেন, জেলা প্রশাসক স্যার ছুটিতে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার অফিস শেষ করে রাতে তিনি ঢাকায় গেছেন। তার অবর্তমানে জেলা প্রশাসক হিসেবে কে দায়িত্ব পালন করবেন, তা লিখিতভাবে কাউকে দিয়ে যাননি। তিনি কবে ফিরে আসবেন তাও আমরা বলতে পারছি না।
রাজিব হোসেন রাজন/মাহফুজ