‘আমাদের মতো গরিব, অসহায় মানুষের জন্য সরকার এই হাসপাতালের ব্যবস্থা করেছে। যেন আমরা কম খরচে চিকিৎসা নিতে পারি। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়নি। হাসপাতালটি অনেক দিন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এখানে চিকিৎসক থাকে না। ওষুধ থাকে না। বেশির ভাগ সময় তালা দেওয়া থাকে। আর খোলা পেলেও কোনো সেবা মেলে না।’ কথাগুলো নড়াইলের কালিয়া উপজেলার শীতলপাটি গ্রামের হামিদুল ইসলামের। তিনি মনে করেন, এই হাসপাতালের সেবা চালু থাকলে তাদের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে চিকিৎসার জন্য নড়াইল সদর কিংবা খুলনায় যেতে হতো না।
হামিদুল ইসলামের অভিযোগের সত্যতা খুঁজতে ঘটনাস্থলে যায় খবরের কাগজ। জানার চেষ্টা করে বাস্তবতা কী? সরেজমিনে গত ২৩ জুন নড়াইলের কালিয়া উপজেলার খড়লিয়া বাজারের পেড়লি মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক বন্ধ। তবে পকেট গেটটি খোলা। কিছু সময়ের মধ্যে সেখানে কয়েকজন নারীকে শিশুসহ আসতে দেখা যায়। কেউ এসেছেন চিকিৎসকের খোঁজে, কেউবা আবার ওষুধ নিতে। কারও প্রয়োজন পরামর্শ। কিন্তু হাসপাতাল ভবনে ঢুকে দেখা যায়, সব কক্ষই তালাবদ্ধ। চিকিৎসক কিংবা ওষুধ কোনোটিই নেই। সেবা না পেয়ে হতাশ হয়ে তারা ফিরে যান।
তাদের একজন মনোয়ারা খাতুন। খালি হাতে ফেরত যাওয়ার ক্ষোভ থেকে তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি চিকিৎসা নিতে। এসে দেখলাম কোনো ডাক্তার নেই। ঈদের ছুটির পর এসেছি। ডাক্তার-ওষুধ কিছুই পেলাম না।’ স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ঠিকভাবে চললে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ সেবা পেতেন। পাঁচ বছর আগে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও জনবলসংকটের কারণে এ অঞ্চলের মা ও শিশুরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কালিয়ার পেড়লি ইউনিয়নের খড়রিয়া বাজারের পাশে ৫০ শতক জমির ওপর নির্মিত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ২০২০ সালে উদ্বোধন করা হয়। ৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে করা হয়েছিল দুটি তিনতলা ভবন। এর মধ্যে একটি হাসপাতাল ভবন। আরেকটি চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোয়ার্টার। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবনে রয়েছে পাঁচ শয্যা করে ১০ শয্যার দুটি ওয়ার্ড ও ১০টি ক্যাবিন। আছে আধুনিক অস্ত্রপচার কক্ষ।
কালিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটিতে রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য পদ আছে ১০টি। এর মধ্যে দুজন চিকিৎসা কর্মকর্তা, একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব), একজন ফার্মাসিস্ট, চারজন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন অফিস সহকারী ও অফিস সহায়ক একজন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালুর পর থেকে অধিকাংশ পদই শূন্য। একজন ফার্মাসিস্ট ও পরিদর্শিকা নিয়োগপ্রাপ্ত রয়েছেন। কিন্তু উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জনবলসংকট থাকায় তাদের সেসব স্থানেও যেতে হয়। ফলে তারা একেকজন এখানে সপ্তাহে দুই দিন করে সময় দেন। সপ্তাহের বাকি দুদিন সংযুক্তিতে আসা একজন চিকিৎসক এখানে থাকেন। সার্বক্ষণিক থাকেন শুধু একজন অফিস সহায়ক, তিনিও অন্য জায়গা থেকে সংযুক্তিতে এসেছেন।
রোগীরা এসে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অফিস সহায়ক রফিকুল ইসলাম জানান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে একজন ফার্মাসিস্ট ও একজন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা কর্মরত আছেন। আর একজন চিকিৎসক (সংযুক্তিতে) আছেন। এই তিনজন সপ্তাহে দুদিন করে রোগী দেখেন। আজ (২৩ জুন) যে চিকিৎসকের আসার কথা ছিল তিনি ছুটিতে আছেন, ফলে রোগীরা এসে ফিরে যাচ্ছেন।
পেড়লি ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের পরিদর্শিকা গীতা রানী বিশ্বাস বলেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে আমরা সেভাবে সেবা দিতে পারি না। আমরা অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের সেবা দিয়ে থাকি। ডেলিভারি, সিজারের মতো সেবা চিকিৎসক না থাকায় দেওয়া যায় না। এখানে আমার একার পক্ষে সেবা দেওয়া সম্ভব না। হাসপাতালে চিকিৎসক প্রয়োজন, আয়া দরকার, একটা নাইট গার্ডও দরকার, এমএলএসএসও নেই। এখানে জনবলের খুবই অভাব। এ জন্য এলাকাবাসী প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আলিফ নূর বলেন, হাসপাতালটি আমরা স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় চালু রাখছি। আমাদের উপজেলা মেডিকেল অফিসার সুবিধাজনক সময়ে সেখানে গিয়ে সেবা দেন। প্রতিদিন হাসপাতাল খোলা থাকে বলে দাবি করেন তিনি।