যশোরে ভোরে প্রাইভেটকার দুর্ঘটনায় হতাহতদের নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। তাদের কর্মকাণ্ডও ছিল বিতর্কিত। প্রাইভেট কারটি চালাচ্ছিলেন এক নারী। ওই নারীর সঙ্গে প্রাইভেট কারের যাত্রীদের কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। এত রাতে তারা কোথায় কী কাজে যাচ্ছিলেন তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। হতাহতরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এ ঘটনায় যে মামলা করা হয়েছে সেটিও রহস্যঘেরা। নিহতদের পরিবারের অনুরোধে ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়। যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।
বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) ভোর ৪টার পর সদর উপজেলার নতুনহাট বাজারসংলগ্ন এলাকায় একটি প্রাইভেট কারের চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে গাড়িটি সড়কের পাশে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক মাসুদুর রহমান মিলন ও তার সহ-যাত্রী প্রাইভেট কারচালক যশোর শহরতলী সুজলপুর গ্রামের আলোচিত নারী আরিফিন আক্তার জুঁই নিহত হন। এ সময় তাদের সঙ্গে থাকা যশোরের আলোচিত সদর উপজেলার এড়েন্দা এলাকার মাসুদ রানা ও তার বন্ধু ফকিরহাট উপজেলার কাটাখালি বেতাগা গ্রামের মামুন গুরুতর আহত হন।
এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে একদিকে যশোরে যেমন শোকের ছায়া নেমে আসে তেমনি সাধারণ মানুষের মাঝেও নানা প্রশ্ন ওঠে। এত রাতে কেন তারা ওই পথে যাচ্ছিলেন? যারা যাচ্ছিলেন, তাদের পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক কী? এসব বিষয় নিয়ে শুরু হয় নানা গুঞ্জন। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবারই কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন নিহত জুঁইয়ের স্বামী লিটন গাজী। তিনি অজ্ঞাত পিকআপচালকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ মামলাকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে রহস্য। কেননা স্থানীয়দের বক্তব্য ও এজাহারে উল্লিখিত ঘটনার ভিন্নরূপ দেখা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, ভোর ৪টার পর হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পান তারা। দ্রুত রাস্তায় এসে দেখেন, কালো রঙের প্রাইভেট কারটি একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে আছে। গাড়িটির চালকের আসনে ছিলেন জুঁই। তার পাশের সিটে বসা ছিলেন মিলন। জুঁইয়ের শরীরের অর্ধেকের বেশি অংশ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়; দুই চোখ বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে, মিলনের মাথার তালু ফেটে যায় এবং পা ও হাত ভেঙে যায়। পেছনে থাকা দুজনের অবস্থাও ছিল গুরুতর। গাড়ির ইঞ্জিন ছিটকে অন্তত ২০ হাত দূরে চলে যায়। দ্রুত পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করা হয়। একপর্যায়ে ঘটনাস্থল থেকেই দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয় এবং অপর দুজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হতাহতদের নিয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, বছর খানেক আগে যশোরের এড়েন্দা বাজারে মাসুদ রানার আরেকটি গাড়ি সড়ক দুর্ঘটনায় এক নারী ও এক পুরুষ নিহত হন। বুধবারের দুর্ঘটনাগ্রস্ত গাড়িটিও ছিল তার মালিকানাধীন। যশোরের চিত্রা সিনেমা হলের সাবেক কর্মচারী মৃত নূর ইসলামের ছেলে মাসুদ রানা নৌবাহিনীতে চাকরি পান। কয়েক বছরের মধ্যে চাকরিচ্যুত হয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন এবং শুরু করেন ‘চাকরি দেওয়ার ব্যবসা’। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে অল্প সময়েই কোটিপতি বনে যান মাসুদ।
মাসুদের প্রতিবেশীরা জানান, তার চার-পাঁচটি দামি গাড়ি রয়েছে। এসব গাড়ি ব্যবহার করে তিনি স্বর্ণ পাচার করেন। কয়েক বছর আগে র্যাবের স্পেশাল টিম ঢাকায় অভিযান চালিয়ে মাসুদের বাড়ি থেকে তাকে আটক করে। কিছুদিন জেল খেটে আবার যশোরে ফিরে আগের মতোই চলাফেরা শুরু করেন।
বিশেষ করে, মধ্যরাতে তার গাড়িগুলো বেনাপোল রুটে চলাচল করে এবং এসব কর্মকাণ্ডে নারীদের ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। মাসুদ রানা বর্তমানে অঢেল সম্পদের মালিক। এমনকি গত ইউপি নির্বাচনে তিনি যশোর সদরের দেয়াড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন।
এদিকে দুর্ঘটনায় আহত মামুন সম্পর্কেও নানা তথ্য উঠে এসেছে। জানা যায়, বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার কাটাখালি বেতাগা গ্রামের মামুন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। সাবেক এমপি শেখ তন্ময়ের এক পিএসের ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মাসুদের ব্যবসায়িক সহযোগী হিসেবে কাজ করেন এবং বর্তমানে যশোর থেকে মাসুদের সঙ্গেই ব্যবসা পরিচালনা করেন।
নিহত ছাত্রলীগ নেতা মাসুদুর রহমান মিলনকে নিয়েও নানা মত পাওয়া গেছে। কেউ বলেন, তিনি ভদ্র ও মার্জিত ছিলেন। অনেকে আবার অভিযোগ করেন, তিনি বিএনপি নেতাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার বিরুদ্ধে জুয়া ও এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যবসার আড়ালে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। মিলনের পরিবারের সদস্যরা জানান, বুধবার রাত ২টায় তিনি বাড়ি ফেরেন এবং ৩টার দিকে একটি ফোন পেয়ে আবার বের হয়ে যান।
নিহত জুঁইকে ঘিরেও নানা তথ্য আসে। তিনি যশোরে বেশ পরিচিত মুখ ছিলেন। ফেসবুক ও টিকটকে নিয়মিত সক্রিয় ছিলেন, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গাড়িতে বিভিন্ন পুরুষের সঙ্গে ছবি ও ভিডিও পোস্ট করতেন। রাতবেরাত তার চলাফেরা ও অশালীন অঙ্গভঙ্গি ছিল স্থানীয়দের আলোচনার বিষয়। এদিকে জুঁইয়ের স্বামী লিটন গাজী মামলায় উল্লেখ করেন, তার স্ত্রী ব্যবসায়িক পার্টনার মিলনের সঙ্গে ঝিকরগাছায় যাচ্ছিলেন। সে সময় পেছন দিক থেকে আসা একটি অজ্ঞাত পিকআপ তাদের গাড়িকে ধাক্কা দেয়, ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে। তবে স্ত্রীর কোন ধরনের ব্যবসা ছিল সে বিষয়ে মামলায় কিছুই উল্লেখ করেননি তিনি। এ বিষয়ে জানতে তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাকে বাড়িতেও পাওয়া যায়নি।
কোতোয়ালি থানার ওসি আবুল হাসনাত জানান, ঘটনার পর থানায় মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, নানা বিষয় নিয়েই পুলিশ তদন্ত করছে।