ঠুকঠাক শব্দে মুখরিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়াবাজারের প্রান্ত। কেউ করাত দিয়ে কাঠ কেটে চলেছেন, কেউ রাঁদা দিয়ে করছেন মসৃণ, আর কেউ বা হাতুড়ি দিয়ে পেরেক ঠুকছেন কাঠের গায়ে। এ যেন এক শিল্পের ঘ্রাণ ছড়িয়ে থাকা নিপুণ কর্মযজ্ঞ। কারণ বর্ষা এসেছে। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন নৌকা তৈরির কারিগররা। এই বর্ষাকালই যেন তাদের মূল ‘মৌসুম’। বছরের অন্য সময় তারা আসবাব তৈরিতে ব্যস্ত থাকলেও বর্ষার তিন মাস নৌকা তৈরির কাঁচামাল থেকে শুরু করে প্রস্তুত করা পর্যন্ত সব কিছুই ঘিরে থাকে ব্যস্ততায়।
স্থানীয়রা জানান, মোগড়াবাজারের নৌকা শিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে আসা উত্তরাধিকার। বাজারের কাঠমিস্ত্রি সাধু সূত্রধর বলেন, ‘বংশগতভাবেই আমি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। বছরের এই সময়টাতে নৌকা তৈরি করি আমরা। ছোট, মাঝারি, বড়- তিন ধরনের নৌকা বানানো হয়। এর মধ্যে ছোট নৌকার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এই ছোট নৌকাগুলোর দাম ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে, মাঝারি ৮ হাজার এবং বড়গুলোর দাম পড়ে ১০ হাজার টাকার মতো। তবে কাঠের গুণাগুণ এবং গ্রাহকের পছন্দ অনুযায়ী দামে তারতম্য ঘটে।
তিতাস নদীঘেঁষা এই অঞ্চলের জেলে, কৃষক ও স্থানীয়রা বর্ষায় চলাফেরার জন্য নৌকার দিকে ঝুঁকছেন বেশি। আখাউড়ার পার্শ্ববর্তী কসবার নিমবাড়ি থেকে আসা মৎস্যজীবী ছাত্তার মিয়া বলেন, ‘প্রতি বছর মোগড়াবাজার থেকেই আমি নৌকা কিনি। এখানকার নৌকা সস্তা, টেকসই এবং দীর্ঘস্থায়ী।’ নান্নু মিয়া নামে এক কৃষক জানান, তিনি মূলত বাজারে এসেছিলেন অন্য কাজে। তবে নৌকাগুলোর গঠন ও কাঠামো দেখে একটি কিনে নেওয়ার কথা ভাবছেন।
ছতুরা শরীফ স মিলের মালিক সিরাজুল ইসলাম শিরু জানান, ‘প্রতি বছর দেড় শ থেকে দুই শ নৌকা তৈরি করি আমরা। এসব নৌকার জন্য টাঙ্গাইল, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাঠ আনতে হয়। দক্ষ কাঠমিস্ত্রি দিয়েই এগুলো বানানো হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘দিন দিন নৌকার চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু কাঠের দাম এবং অন্যান্য খরচও বাড়ছে সমান তালে।’
নৌকা ব্যবসায়ী মো. সহিদ মিয়া বলেন, ‘৭০ বছরের বেশি সময় ধরে আমি এ পেশায় আছি। পুঁজি না থাকায় এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালাতে হয়। কিস্তি শোধ করতেই অনেক সময় লাভের অংশটা কমে আসে।’
আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জি এম রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘মোগড়াবাজারে প্রায় শতাধিক নৌকা তৈরির কারিগর রয়েছেন। তারা দক্ষ এবং টেকসই নৌকা তৈরি করেন। তাদের উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। তারা যদি সবাই মিলে সহযোগিতা চান, আমরা সরকারি সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করব।’
মোগড়াবাজারের এই নৌকা শিল্প কেবল একটি মৌসুমি ব্যবসা নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার মানুষ যুগ যুগ ধরে বয়ে এনেছে। সময় এসেছে সরকার, সমাজ ও উদ্যোক্তাদের এক সঙ্গে এগিয়ে এসে এই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখার। এতে ভাটির দেশে নৌকার ঠুকঠাক শব্দ শোনা যাবে আরও অনেক বছর।