সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় মন্থার প্রভাবে সৃষ্ট ঝড়-বৃষ্টিতে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমির ফসল আংশিক বা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২ লাখেরও বেশি কৃষক। সব মিলিয়ে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অন্তত ৬০ কোটি টাকায়।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ১ নভেম্বর পর্যন্ত টানা চার দিনের ঝড়-বৃষ্টিতে রোপা আমন, সবজি, মসলা ও পান চাষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষি অঞ্চলে—বগুড়া, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলায়। এ চার জেলার ক্ষতির পরিমাণই প্রায় ৩৮ কোটি টাকা।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল শামসুদ্দীন ফিরোজ বলেন, ‘মন্থার প্রভাবে ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিতে বগুড়া অঞ্চলের ১ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে ৪২ হাজার ৮১২ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু বগুড়াতেই সবজির ক্ষতি হয়েছে ৬ কোটি টাকারও বেশি। সব মিলিয়ে ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৯ টন।’ চাষিদের করণীয় বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ধানের গাছগুলো দাঁড় করিয়ে বেঁধে দিলে ক্ষতি কম হবে। যেসব জমিতে পানি জমেছে, সেখান থেকে দ্রুত পানি বের করে দিলে ধান, সবজি ও মসলার ক্ষতি কমবে।’
শিবগঞ্জ উপজেলার ধোন্দাকলা গ্রামের কৃষক শ্রী নিৎপল এ বছর দশমিক ৪০ হেক্টর জমিতে ফুলকপি চাষ করেছিলেন। প্রায় সাত হাজার চারা লাগাতে তার খরচ হয় ৬০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করেছিলাম ফুলকপি বিক্রি করে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা আয় করব। কিন্তু বৃষ্টির কারণে পুরো খেত নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো কপিই আর বিক্রির উপযোগী নেই।’
সদর উপজেলার মেঘাগাছা গ্রামের রবিউল ইসলাম জানান, তিনি মহাস্থান হাট থেকে পাইকারি সবজি কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। তার পরিবার দশমিক ৫০ হেক্টর জমিতে গাজর, ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করেছিলেন। রবিউল বলেন, ‘বৃষ্টিতে গাজর, ফুলকপি আর বাঁধাকপির গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের গ্রামের প্রায় সবাই ক্ষতির মুখে পড়েছে।’
নন্দীগ্রাম উপজেলার পশ্চিমপাড়া গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম এ বছর প্রায় দুই হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ করেন। টানা বৃষ্টিতে তার খেত তলিয়ে যায়। বাধ্য হয়ে তিনি কাঁচা ধান কেটে নেন। আশরাফুল বলেন, ‘ধারণা ছিল চার টন ধান পাব, কিন্তু অপরিপক্ব হওয়ায় মিলবে হয়তো ৫০০ কেজির মতো। এক লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।’
রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের চার জেলা- চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁয়ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ১ হাজার ৬৪৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে, এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪২ হাজার ৮৯৯ জন চাষি। আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ১০ লাখ টাকারও বেশি।
রাজশাহীতে পানচাষিদের ক্ষতি তুলনামূলক বেশি। ২০ হেক্টর বরজের পান নষ্ট হয়ে গেছে, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২ কোটি ৮১ লাখ টাকা। বরেন্দ্র অঞ্চলের অনেক জায়গায় জমিতে পানি আটকে আছে, নুয়ে পড়েছে ধানের শিষ। ফলে শীতকালীন সবজিরও বড় ক্ষতি হয়েছে।
রংপুর কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও রংপুরে রোপা আমনসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আলু, মরিচ ও গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজসহ নানা ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৭৭ হেক্টর জমিতে। এতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।’
দিনাজপুর কৃষি অঞ্চল, যার অন্তর্ভুক্ত পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁ ও দিনাজপুর- তাতেও ফসলের ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। ওই অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘ঝড়-বৃষ্টিতে ফসল ক্ষতি হয়েছে ৩০৭ হেক্টর জমির, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ২৭ লাখ টাকারও বেশি।’
তিনি জানান, আলুর জন্য খ্যাত এ অঞ্চলে কেবল আলুতেই ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার। ২৭০ টন সবজি ও ৮৯১ টন রোপা আমনও নষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৮৭৩ টন ফসলের ক্ষতি হয়েছে । কৃষি কর্মকর্তারা জানান, এবার ঝড়-বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আলু, বাঁধাকপি ও ফুলকপিতে। তবে আর্থিক দিক থেকে রোপা আমনের ক্ষতিই সবচেয়ে বড়।
উত্তরাঞ্চলের মাঠে এখনো অনেক ধান পড়ে আছে, কোথাও কোথাও জমিতে পানি আটকে রয়েছে। কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, আবহাওয়া দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বাকি ফসলও নষ্ট হবে।