নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ বাতিলসহ চার দফা দাবিতে চট্টগ্রাম বন্দরে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দুই সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর ও ইব্রাহিম খোকন।
বাকি তিন দফা দাবি হচ্ছে, ১. চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান এসএম মনিরুজ্জামানকে চেয়ারম্যান পদ থেকে প্রত্যাহার করা। ২. বিগত আন্দোলনে যেসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে বদলি, চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতিসহ নানাবিধ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা বাতিল করে প্রত্যেক কর্মচারীকে চট্টগ্রাম বন্দরের স্ব স্ব পদে পুনর্বহাল করতে হবে। ৩. আন্দোলনরত শ্রমিকনেতাদের বিরুদ্ধে কোনোরূপ মামলাসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
সংবাদ সম্মেলনে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, গত ৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরে নৌ পরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন এসেছিলেন। তার সঙ্গে হওয়া বৈঠকে পূর্ণাঙ্গ কোনো আশ্বাস আমরা পাইনি। ব্যবসায়ীদের ক্ষতি ও রোজার পণ্য খালাসের কথা বিবেচনা করে আমরা লাগাতার কর্মবিরতি কর্মসূচি দুইদিনের (শুক্র ও শনিবার) জন্য স্থগিত করেছিলাম। তবে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আন্দোলনকারীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ তদন্তের জন্য বন্দর চিঠি দেয়। বন্দর চেয়ারম্যান এই পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করেছেন। তাই আবার লাগাতার কর্মসূচিতে যাওয়া ছাড়া আমাদের কোনো উপায় ছিল না।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর, ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুন, সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, কার্যকরী সভাপতি আবুল কাসেম, মার্চেন্ট শ্রমিক ইউনিয়নের সমন্বয়ক ইয়াসিন রেজা রাজু, জাহিদ হোসেন, মো. হারুন, উইন্সম্যান সমিতির ইমাম হোসেন খোকন, শরীফ হোসেন ভুট্টো প্রমুখ।
গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এনসিটি রক্ষার আন্দোলনের গতি কমে আসে। তবে গত ২৯ জানুয়ারি দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেদিন বেলা সাড়ে ১১টায় ওই রায়কে কেন্দ্র করে অফিস চলাকালে চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু কর্মচারী বন্দর ভবনে এবং বন্দর ভবন এলাকায় মিছিলে অংশ নেন। এর পর থেকে দিনে দিনে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন আরও চাঙা হয়ে ওঠে।
গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। গত ৩ ফেব্রুয়ারি কর্মবিরতির সময় ৮ ঘণ্টা থেকে বেড়ে ঠেকেছে ২৪ ঘণ্টায়।
পরে তারা মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করেন। এর মধ্যে গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেয় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। সেদিন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে সমর্থন দেয় শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। চলে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
শ্রমিক-কর্মচারীদের টানা ছয় দিন কর্মবিরতির কারণে বন্দর জেটিতে পণ্য খালাসের জন্য কোনো জাহাজ ভিড়তে পারেনি, কোনো জাহাজ পণ্যবাহী কনটেইনার নিয়ে বন্দর ছেড়ে যেতে পারেনি। এ কারণে বন্দর ও বিভিন্ন বেসরকারি ডিপোতে কনটেইনারের স্তূপ বাড়তে থাকে, কমে যায় কনটেইনার ডেলিভারি। জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় বাড়তে থাকায় আমদানিকারককে গুনতে হয়েছে ডেমারেজ (জরিমানা)। পণ্যবাহী পরিবহন চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।
বিষয়টি নিয়ে শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে গত ৫ ফেব্রুয়ারি সকালে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে আসেন নৌ উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন। সেদিন সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে তিনি শ্রমিকদের তোপের মুখে পড়েন। পরে গাড়ি থেকে নেমে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বসে আলোচনার অনুরোধ করেন। তখন শ্রমিকনেতারা দাবি করেন, বন্দর চেয়ারম্যান বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারবেন না। উপদেষ্টা আশ্বাস দেন, বৈঠকে বন্দর চেয়ারম্যান থাকবেন না। তিনি শুধু শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলবেন। এরপরই প্রতিবাদকারীরা তাকে যেতে দেন।
বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসলেও মেলেনি কোনো সমাধান। পরে নৌপরিবহন উপদেষ্টার অনুরোধে শ্রমিক নেতারা দুই দিনের (শুক্র ও শনিবার) জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করেন। বন্দর ও বেসরকারি ডিপোগুলোতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে পুরোদমে কাজ শুরু হয়।
কিন্তু গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে নৌপরিবহন উপদেষ্টার চট্টগ্রাম ছেড়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আন্দোলনরত ১৫ কর্মচারীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও এজেন্সিকে অনুরোধ জানায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি এই কর্মচারীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনকেও (দুদক) অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং এক পর্যায়ে তারা এই সিদ্ধান্ত নেন।
নাঈম/