আমরা প্রতি ভোটেই নেতা বানাই, কিন্তু পরে কেউ আমাদের খোঁজ নেন না। এইবার আমরা এমন মানুষকে ভোট দিতে চাই, যে চা শ্রমিকদের কথা বলবেন, আমাদের কষ্টের কথা তুলে ধরবেন। মৌলভীবাজারের নারী চা-শ্রমিক মিনা পাশীর কণ্ঠে উঠে আসে এমন কথা।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেল পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের পদচারণায় মুখর ছিল দেশের এই চায়ের জনপদ।
পাহাড়ি টিলা বেষ্টিত চায়ের দেশ খ্যাত মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে ৯২টি চা বাগান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মিনা পাশীদের মতো চা-শ্রমিকদের দাবি ও প্রত্যাশা এমনটাই। তারা বলছেন-ভোট দিতে যাবেন তবে এই ভোটে যেন তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন আসে। প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি নয়, তারা চান বাস্তবায়ন।
বরাবরই প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে চা শ্রমিকদের ভোট বড় ভূমিকা রাখে। চা শ্রমিকদের ভোট যেদিকে যায় বিজয়ও সেদিকেই যায়। তাই এ জেলার ৪টি সংসদীয় আসনের প্রার্থীরা সব সময়ই সেই বিষয়টি মাথায় রেখে অগ্রাধিকার দিয়ে এই নির্দিষ্ট ভোট নিজেদের পক্ষে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলার ৪টি আসনে ২৪ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজারে ২৩ হাজার ৭৩১ পোস্টাল ভোটসহ মোট ভোটার রয়েছেন ১৬ লাখ ১৪ হাজার ৯৩০ জন।
জানা গেছে, জেলার চার আসনেই জয়-পরাজয়ে নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ৯২টি চা বাগানে প্রায় ৩ লক্ষাধিক চা শ্রমিকদের ভোট। ভোটের অঙ্কে বড় একটি অংশ চা শ্রমিক হওয়ায় ভোট এলেই বাড়ে চা-শ্রমিকদের কদর।
গত কয়েকদিন ধরে চা বাগান সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রার্থীরা সাধারণ পথসভার চেয়ে বাগানভিত্তিক উঠান বৈঠক ও শ্রমিক সমাবেশকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রার্থীদের প্রধান প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি, বর্তমান বাজার দরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি পুননির্ধারণের আশ্বাস। দীর্ঘদিনের দাবি ‘ভূমি অধিকার’ নিশ্চিত করার জোরালো প্রতিশ্রুতি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, বাগান এলাকায় উন্নত স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের কথাই উঠে এসেছে প্রচারণায়।
রাজনগর চা বাগানের শ্রমিক নিরু গোয়ালা বলেন, নেতারা ভোটের আগে বাগানে আসেন, পরে আর খোঁজ নেন না। এবার আমরা হিসাব করে ভোট দেব।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার এক নারী চা শ্রমিক বলেন, চা বাগানে কাজ করি, কষ্ট করি। কিন্তু স্বাস্থ্য আর শিক্ষার সুযোগ খুবই কম। যারা এসব নিয়ে কাজ করবে, আমরা তাদেরই সমর্থন দেব।
কমলগঞ্জের এক শ্রমিক বলেন, দৈনিক মজুরি দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। আমরা বছরের পর বছর ভোট দিই, কিন্তু আমাদের মজুরি আর বাড়ে না।
চা জনগোষ্ঠীর সদস্য মিন্টু দেশোয়ারা বলেন, মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা আর শিক্ষা-এই তিনটা বিষয় আমাদের সবচেয়ে বড় দাবি। যে এগুলো নিশ্চিত করবে, আমরা তার দিকেই যাব।
চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করছেন এস এম শুভ। তিনি বলেন, মৌলভীবাজারের কয়েকটি আসনে চা শ্রমিকদের ভোটই ফল নির্ধারণ করে। তাই প্রার্থীদের কাছে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও জীবনমান উন্নয়নের স্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা জরুরি। চা শ্রমিকরা এখন অনেক সচেতন। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, তারা বাস্তবায়ন দেখতে চায়।
কানিহাটি চা বাগানের শ্রমিক নেতা সীতারাম বীন বলেন, আমাদের ভোটে যেহেতু জয়-পরাজয়, তাই এবার আমরা হিসাব করেই ভোট দেব।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের মনু-দলই ভ্যালির সভাপতি ধনা বাউরী বলেন, আমাদের চা শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে, যার মধ্যে মজুরি, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত অন্যতম। প্রার্থীরা প্রতিবারই ভোটের আগে আসেন, অনেক কথা বলেন। তবে এবার আমরা সচেতন। যে আমাদের আবাসন ও রেশন সমস্যার স্থায়ী সমাধান করবে, তাকেই আমরা সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চাই।
পুলক পুরকায়স্থ/নাঈম