রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির নীলফামারীর সৈয়দপুর শাখা থেকে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। কম্পিউটারের কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমে দীর্ঘ দুই বছর ধরে ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাব থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে ওই শাখার সিনিয়র অফিসার আলিমুল আল রাজি তমালের নাম উঠে এসেছে। টাকা আত্মসাতের পর তিনি পরিবারসহ দুবাই পালিয়ে গেছেন বলে কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সহকর্মীদের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে নিজের ও কয়েকটি ভুয়া ব্যাংক হিসাবে টাকা স্থানান্তর করেছেন তমাল। এভাবে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা রয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আত্মসাৎ করা অর্থের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১৫ কোটি টাকা সরানো হয়েছে রংপুর বাস টার্মিনাল এলাকার ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো শাখার একটি হিসাবে। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেছেন শাখার সাবেক ম্যানেজার আব্দুল লতিফ। অভিযোগ রয়েছে, এ জন্য তিনি প্রায় ৪৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল লতিফ বলেন, বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন থাকায় তিনি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না।
এ ঘটনায় শুধু আব্দুল লতিফই নন, আরও ডজনখানেক কর্মকর্তা পরোক্ষভাবে লাভবান হয়েছেন বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে আরও দেখা যায়, আত্মসাতের কাজে কয়েকটি সন্দেহজনক ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে নিলুফার আক্তার ও রোদেলা আক্তারের নামে খোলা অগ্রণী সুপার সেভিংস অ্যাকাউন্ট উল্লেখযোগ্য। আরটিজিএস পদ্ধতিতে নিলুফার আক্তারের অ্যাকাউন্টে ৭ কোটি ২৭ লাখ এবং রোদেলা আক্তারের অ্যাকাউন্টে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়। ব্যাংকের ওয়েবসাইটে এসব হিসাবের বিপরীতে কোনো ছবি, স্বাক্ষর বা হিসাব খোলার আবেদনপত্রের কপিও পাওয়া যায়নি।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তমাল নিজের অ্যাকাউন্টে প্রায় ১০ কোটি টাকা নিয়েছেন। এ ছাড়া বড় ছেলের নামে খোলা তৌহিদ ডেইরি খামারের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৫০ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়। এ ছাড়া সহযোগী কর্মকর্তা আব্দুল লতিফের শ্যালক মেহেদী হাসানের প্রতিষ্ঠান ‘মন্নুজান ট্রেডার্স’-এর অ্যাকাউন্টে আরও প্রায় ৪০ লাখ টাকা সরানো হয়েছে।
মেহেদী হাসান দাবি করেন, তার অ্যাকাউন্টের চেকবই তমাল ও আরেকজন সহকর্মী নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তিনি নিজে কখনো সেই হিসাব থেকে কোনো টাকা তোলেননি।
এদিকে ব্যাংকের সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। বিনা ভাউচার বা চেক ছাড়াই দীর্ঘদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হলেও তিনি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি দায় চাপিয়েছেন ব্যাংকের কেন্দ্রীয় আইটি বিভাগের ওপর।
অন্যদিকে জোনাল অফিস ও জিএম অফিসও নিয়মিত নিরীক্ষা করলেও এত বড় জালিয়াতি ধরা না পড়ায় প্রশ্ন উঠেছে তদারকি নিয়ে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শাখার প্রতিদিনের কার্যক্রম খুঁটিয়ে দেখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
অগ্রণী ব্যাংক রংপুর অঞ্চলের আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান রিনো বলেন, এ ঘটনায় শুধু প্রধান অভিযুক্ত নন, বরং শাখা ব্যবস্থাপক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং অডিট টিমেরও দায় রয়েছে। তবে আত্মসাৎ করা অর্থ পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি সন্দিহান।
তবে সৈয়দপুর শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান জানিয়েছেন, ঘটনার প্রতিবেদন পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
জানা গেছে, গত ১৫ জানুয়ারি থেকে অফিসে অনুপস্থিত রয়েছেন আলিমুল আল রাজি তমাল। এ ঘটনায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে এবং বিষয়টি রংপুর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়কে জানানো হয়েছে। পরে মামলা করার অনুমতি চেয়ে ঢাকার দুদক কার্যালয়ে আবেদন করেছে রংপুর অফিস।
এদিকে অভিযুক্ত তমালকে খুঁজতে রংপুরের রহমতপুরে তার বর্তমান ঠিকানা ও নীলফামারী সদরের কাঞ্চনপাড়ার স্থায়ী ঠিকানায় খোঁজ নিলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তার কয়েকজন সহকর্মী ও স্বজন জানিয়েছেন, তিনি বাবা, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।