চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রা পুড়ছে রাজশাহী। টানা বৃষ্টি না থাকায় রোদ ও গরম বেড়েছে। এতে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ। তার ওপর ঘন ঘন লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে। তাপমাত্রা বাড়ায় এই প্রবণতা আরও কয়েক দিন থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০ এপ্রিলের পর থেকে তা ঊর্ধ্বমুখী হয়। গত মঙ্গলবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা বুধবার ৪০ ডিগ্রিতে পৌঁছায়। এটি চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বৃষ্টি না থাকায় ও আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় তাপদাহ আরও তীব্র হয়েছে।
তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন রিকশাচালক, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ। শহরের লক্ষ্মীপুর এলাকার রিকশাচালক শাহজাহান বলেন, ‘এই গরমে একটানা রিকশা চালানো একদম সম্ভব না। রাস্তায় নামলেই শরীর দুর্বল লাগে, মাথা ঘোরায়। মাঝে মাঝে ছায়ায় বসে থাকতে হয়। যাত্রীও কমে গেছে, তাই আয়ও আগের মতো নেই। সংসার চালানো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
আব্দুল করিম নামে আরেক রিকশাচালক বলেন, ‘দুপুরের রোদে রিকশা চালানো যায় না। গরমে মাথা ঝিমঝিম করে, চোখে অন্ধকার লাগে। আগে যত যাত্রী পাওয়া যেত, এখন সেটা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই অবস্থায় টিকে থাকা কঠিন।’
নগরীর শালবাগান এলাকার দিনমজুর সোহেল রানা বলেন, ‘আমরা যারা দৈনিক মজুরিভিত্তিতে কাজ করি, তাদের কাজ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এই গরমে মাঠে বা রাস্তায় কাজ করা খুবই কষ্টকর হয়ে গেছে। শরীর ঘেমে একেবারে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, বারবার পানি খেতে হচ্ছে। তবুও কাজ বন্ধ করার সুযোগ নেই।’
শিক্ষার্থীরাও তাপদাহে বিপাকে পড়েছেন। রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, ‘দুপুরে ক্যাম্পাসে যাওয়া খুব কষ্টকর হয়ে গেছে। রোদের কারণে মাথা ব্যথা করে, ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া যায় না। অনেক সময় গরমের কারণে ক্লাস শেষ না করেই বাসায় ফিরে আসতে হয়।’
ব্যবসায়ীদের অবস্থাও ভালো নয়। নগরীর দড়িখরবোনা এলাকার চা বিক্রেতা সজল আলী জানান, গরমের কারণে দোকানে ক্রেতা কমে গেছে। মানুষ এখন ঠাণ্ডা পানীয় বা জুসের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। চায়ের বিক্রি আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। সারা দিন বসে থাকলেও আয় হচ্ছে না।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রচণ্ড গরমে নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে মানুষের চলাচল কমে গেছে। দুপুরের দিকে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে বের হচ্ছেন না। তবে শিশু-কিশোররা কিছুটা স্বস্তি পেতে টিউবওয়েল কাছে ও পুকুর পাড়ে ভিড় করছে।
অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। নগরবাসীর অভিযোগ, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বাসাবাড়িতে গরমের কষ্ট আরও বেড়ে যাচ্ছে। ফ্যান বা কুলার বন্ধ হয়ে গেলে ঘরের ভেতরও অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এতে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা বিড়ম্বনায় শিকার হচ্ছে। বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা তাদের পড়াশোনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পবা উপজেলার পারিলা উচ্চবিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থী রাজিয়া সুলতানা বলে, ‘পড়তে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। গরমে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, আবার আলো না থাকায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও সম্ভব হয় না। এতে করে প্রস্তুতিতে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।’ অভিভাবকরা এ কারণে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তাদের অভিযোগ, রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সন্তানরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না, এতে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পরীক্ষার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এখনো তাপমাত্রা বাড়ার প্রবণতা রয়েছে। আগামী কয়েক দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা খুব কম। ফলে তাপদাহ অব্যাহত থাকতে পারে। এই সময়ে গরম বাতাস ও আর্দ্রতা কমে যাওয়ার কারণে তাপমাত্রা বেশি অনুভূত হচ্ছে। ফলে জনজীবনে চাপ বাড়ছে।’