মা! পৃথিবীর সবচাইতে মধুর একটি নাম। শুধু নামেই নয়, সন্তানের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থলও এই মা। মায়ের মমত্ব, আত্মত্যাগ নিঃস্বার্থ ও অসীম। পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র এই বন্ধন সন্তানের জীবনের ভিত গড়ে দেয়। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেন মা। তিনি সব সময় নিজের সুখ আর স্বপ্ন বিসর্জন দেন। এমনিভাবেই মা দিবসে সন্তানকে নিজের কিডনি উপহার দিতে ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন এক মা।
শরীয়তপুরের জাজিরা পৌরসভার উত্তর বাইকশা এলাকার গৃহবধূ নাসিমা সুলতানা। তিনি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। স্বামী শাহজান মিয়া মারা যাওয়ার পর তার বেঁচে থাকার অবলম্বন ছেলে নাসিম জাহান আকাশ ও মেয়ে বৃষ্টি আক্তার। সবকিছু ঠিকঠাক চললেও কয়েক মাস আগে ছেলে নাসিম জাহান আকাশ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরীক্ষা করে চিকিৎসক জানান আকাশের দুটি কিডনিই বিকল।
এরপর থেকে ছেলের চিকিৎসা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিল মা। পরে সন্তানের জীবন বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নাসিমা সুলতানা।
রবিবার (৯ ম) সন্ধ্যায় বিশ্ব মা দিবসের দিনেই ঢাকার একটি হাসপাতালে ছেলে আকাশের কিডনি প্রতিস্থাপনের অপারেশন শুরু হয়। অপারেশনটি করেন দেশের খ্যাতিমান কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ও ইউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম।
উত্তর বাইকশা এলাকার ইমরান হোসাইন বলেন, জাজিরা উপজেলা আবারও এক মানবিক ঘটনার সাক্ষী হলো। সন্তানের জীবন বাঁচাতে আকাশের মা নিজের শরীরের একটি কিডনি দান করছেন।
একজন মা শুধু সন্তানকে জন্মই দেন না, প্রয়োজনে নিজের শরীরের অংশ দিয়েও সন্তানের জীবন রক্ষা করেন। আকাশ হয়তো সারা জীবন মনে রাখবেন, একবার মা তাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিলেন, আরেকবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে এনে নতুন জীবন উপহার দিলেন।
জাজিরার এই ঘটনা শুধু একটি চিকিৎসা নয়, এটি মা সন্তানের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আল্লাহর রহমতে আকাশ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক, এমন দোয়া সবার।
শিবলী সুলতানা নামের এক শিক্ষিকা বলেন, একজন মা সন্তানের প্রথম শিক্ষক। নাসিমা সুলতানা একজন প্রধান শিক্ষক হয়ে শুধু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আলোকিত করেননি, নিজের সন্তানের জীবন বাঁচাতে কিডনি দান করে মমতা, ত্যাগ ও মানবতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিশ্ব মা দিবসে তার এই আত্মত্যাগ শুধু একজন মায়ের ভালোবাসাই নয়, পুরো শিক্ষক সমাজের জন্যও গর্বের। শিক্ষক সমাজ আকাশ ও তার মায়ের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।
এ ব্যাপারে আকাশের বড় বোন বৃষ্টি আক্তার বলেন, মা দিবসে সন্তানকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপহারটা দিচ্ছে আমার মা। নিজের সন্তানের জীবন বাঁচাতে নিজের কিডনি দিচ্ছেন তিনি। সবার কাছে আমার মা ও ভাইয়ের জন্য দোয়া চাই।
জাজিরা উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মিনহাজুর রহমান বলেন, আমার শিক্ষকদের মধ্যে মিষ্টভাষী এবং একজন ভালো মনের মানুষ নাসিমা সুলতানা। তিনি নিজেও শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ। তবে ছেলের জন্য এই অবস্থায় তিনি নিজের কিডনি দিতে পিছপা হননি। আসলে মায়েদের কোনো তুলনা হয় না। আমরা শিক্ষা অফিস সব সময় তার পাশে আছি। তার আর্থিক সমস্যা হলে আমরা তার পাশে দাঁড়াব।
বিষয়টি নিয়ে নাসিমা সুলতানার জামাতা মুস্তাফিজুর রহমান রবিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বলেন, ‘আমরা রাজধানীর শ্যামলীর একটি হাসপাতালে অবস্থান করছি। ইতোমধ্যে আমার শাশুড়ি ও শ্যালককে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছে। কিডনি প্রতিস্থাপনের অপারেশন চলছে।’