চট্টগ্রামে হাম আক্রান্তের হার কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। রোগটির উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই নগরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে শিশু।
দেখা দিচ্ছে নিউমোনিয়া সহ নানা জটিলতা। তবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার তুলনায় নগরে এই রোগের উপসর্গ বেশি দেখা দিচ্ছে।
এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ ও আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১২ জন।
চিচিকৎসকরা বলছেন, চট্টগ্রামে হামের টিকা লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ দেওয়া হয়েছে। এই টিকা শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে কমপক্ষে চার সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় লাগে। পাশাপাশি একটি রোগ যখন মহামারী আকার ধারণ করে সেটার প্রকোপ কমতে একটু সময় লাগে। হাম আক্রান্ত একজন শিশু থেকে ১৮ জনের শরীরে রোগটি ছড়ায়। তাই শিশুদের ভিটামিন ও প্রোটিনসম্বৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি সচেতনতাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হাম ব্লকে ১ নং ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে হাম উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের চিকিৎসা চলছে। ওয়ার্ডটিতে থাকা ৮০টি বেডের কোনটিই খালি নেই। সেখানে অবস্থানরত শিশুরা গায়ে র্যাশ ও জ্বরে ভুগছে। শ্বাসকষ্ট হলে শিশুদের দেওয়া হচ্ছে অক্সিজেন। হাসপাতালটিতে শিশুদের জন্য ২০টি আইসিইউ রয়েছে, এরমধ্যে ১৫টি হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বরাদ্দ রেখেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রামে মার্চের পর থেকেই হামের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের গত দুই মাসের (এপ্রিল ও মে) হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর হার যাচাই করেছে খবরের কাগজ। সেখানে দেখা গেছে, এপ্রিলে হামের উপসর্গ নিয়ে নগরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭০০ শিশু, পাশাপাশি উপজেলায় আক্রান্ত হয়েছে ১৯ জন। মাসটিতে গড়ে নগরে প্রতিদিন ২৩ জন শিশু হাম উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
তবে মে মাসে সবচেয়ে বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে নগরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মে মাসে শিশুদের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার হার এপ্রিলের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেশি। এপ্রিলে নগরের ৭০০ শিশুর শরীরে হামের উপাসর্গ দিখো দিয়েছে। আর মে মাসে নগরের ১ হাজার ৩৭৫ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এছাড়া মাসটিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ৬৬ জন শিশুর শরীরে হামের উপসর্গহ দেখা দেয়। এই মাসে নগরে গড়ে প্রতিদিন ৪৪ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে যায়।
জুন মাসেও আক্রান্তের হার কম নয়। গত ১ জুন নগরে ৫৩ ও উপজেলায় ২ জন, ২ জুন নগরের ৪৩ জন ও ৩ জুন নগরের ৬০ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, গত ৩ জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৩৬৫ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে নগরের ২ হাজার ২৭৪ জন ও উপজেলার ৯১ জন। এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৮৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছে ২৭৬ জন। চট্টগ্রাম থেকে এখন পর্যন্ত নগর ও উপজেলা মিলিয়ে ১ হাজার ৪১৮ জন শিশুর নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত হাম সন্দেহে মারা গেছে নয় জন ও হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে তিন জন।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রামে নগর ও উপজেলা মিলে লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। জেলা পর্যায়ে আমাদের হামের রোগী কমে গেছে। চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, রাঙ্গমাটি, বান্দরবন থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে রোগীরা চমেক বা জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে আসছে। এ কারণে নগরে বেশি দেখা যাচ্ছে। একটা রোগ মহামারী আকার ধারণ করলে সেটা কমে আসতে দুই-তিন মাস সময় লাগে। আশা করি হাম আক্রান্তের হার দ্রুত কমে যাবে।
টিকা দেওয়ার পরেও কেউ হামে আক্রান্ত হচ্ছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টিকা দেওয়া হয়েছে, তবে এটার পুরো ফল পেতে আমাদের কয়েকমাস সময় লাগবে। যেহেতু এন্টিবডি তৈরি হতে কয়েক মাস সময় লাগে। তবে কিছু ফল পেতে শুরু করেছি। তবে বড়দের ক্ষেত্রে নিয়মিত মাস্ক পরিধান করা, হ্যান্ডওয়াশ ব্যবহার করা জরুরি। আর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ভীড় এড়িয়ে চলতে হবে, যেসব বাড়িতে হাম হচ্ছে সেখানে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি শিশুরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর শিশুকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ও প্রোটিনযুক্ত খাবার দিতে হবে। অন্তত দেড় মাস চিকিৎসকের পরামর্শ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এই জায়গায় কোনভাবেই অবহেলা করা যাবে না।
তারেক মাহমুদ/এসএন