পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে জমে উঠতে শুরু করেছে রাজশাহীর পশুর হাটগুলো। নগরীর সিটিহাটসহ জেলার বিভিন্ন হাটে এখন বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়। দেশের নানা এলাকা থেকে ট্রাকভর্তি গরু, মহিষ ও ছাগল আসছে হাটে। তবে এবার বড় গরুর চেয়ে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর প্রতিই বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে ক্রেতাদের মধ্যে।
হাট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পশুর সরবরাহ ও বেচাকেনা দুটোই বাড়ছে। বাইরের জেলা থেকে আসা ব্যাপারীদের উপস্থিতিও বেড়েছে।
রাজশাহীতে সিটিহাট, নওহাটা, কাঁটাখালি, গোদাগাড়ীর মহিষালবাড়ি ও কাঁকনহাট, বাগমারার মচমইল ও তাহেরপুর, মোহনপুরের কেশরহাট এবং পুঠিয়ার বানেশ্বরসহ অন্তত ১০টি বড় পশুর হাট বসেছে। এর মধ্যে নগরীর সিটিহাট উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় পশুর বাজার হিসেবে পরিচিত।
রবিবার (২৪ মে) সরেজমিনে বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের উপস্থিতি। দূর-দূরান্ত থেকে ট্রাকভর্তি পশু নিয়ে আসছেন ব্যাপারীরা। ছোট গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত। মাঝারি গরু বিক্রি হচ্ছে ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে বড় গরুর দাম দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকার মধ্যে হলেও তুলনামূলকভাবে সেসব গরুর ক্রেতা কম দেখা গেছে।
পবা উপজেলার পারিলা এলাকার খামারি পারভেজ হোসেন বলেন, মাঝারি আকারের তিনটি গরু এরই মধ্যে ভালো দামে বিক্রি করেছি। তবে বড় গরুটির দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় সেটি এখনো বিক্রি করেননি।
নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা বিপুল হোসেন বলেন, ‘প্রতি বছর আমরা সাতজন মিলে একটি গরু কিনি। আগে প্রায় ৩ মণ ওজনের গরু ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকায় পাওয়া যেত। এবার ৬০ হাজার টাকাতেও তেমন গরু মিলছে না।’
তবে সব ক্রেতার অভিজ্ঞতা এক নয়। গরু কিনতে আসা আব্দুস সামাদ বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় মাঝারি গরুর দাম কিছুটা সহনীয় মনে হচ্ছে।’ অন্যদিকে খাসির বাজারেও রয়েছে বাড়তি চাপ। আশরাফ আলী নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘এবার খাসির দাম গতবারের তুলনায় কিছুটা বেশি। তাই দাম বাড়ার আগে আগেভাগেই কিনে নিয়েছি।’
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছর রাজশাহী জেলায় কোরবানির জন্য প্রায় ৪ লাখ ৬৩ হাজার গবাদিপশু প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৪ হাজার ৮৪১টি গরু, ৩ হাজার ৪২৫টি মহিষ, ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৩৯টি ছাগল এবং ৪৩ হাজার ৪০৬টি ভেড়া রয়েছে। জেলার চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৯২ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
জেলায় বর্তমানে প্রায় ২৬ হাজার ২৩৪টি ছোট-বড় খামার রয়েছে। এছাড়া অনেক পরিবার নিজ উদ্যোগেও কোরবানির পশু পালন করেছে। পুরান তাহিরপুর এলাকার খামারি আসাদ আলী বলেন, ‘আমার গোয়ালে পাঁচটি ষাঁড় রয়েছে। ভারতীয় গরু না এলে দেশীয় গরুর ভালো দাম পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।’
বাগমারার তাহেরপুর হাটেও উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। সেখানে গরু, মহিষ ও ছাগল কেনাবেচায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে দালালদের উৎপাত নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে পাইকারদের মধ্যে। পাইকার জুনায়েদ আহম্মেদ বলেন, ‘এখনো অতিরিক্ত হাসিল নেওয়া না হলেও দালালদের উৎপাত অনেক বেশি। আবার আগেভাগে ক্রেতা আসায় বিক্রেতারাও দাম কমাতে চাইছেন না।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, গত বছর যে গরু ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবার একই ধরনের গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা।
সিটিহাটের ইজারাদার শওকত আলী বলেন, ‘এবার গরুর আমদানি ভালো। হাটও জমজমাট। বাইরের জেলা থেকেও ব্যাপারীরা এসেছেন। তবে হাটের বাইরে থেকেও অনেক মানুষ গরু কিনছেন। ছোট ও মাঝারি গরুই বেশি বিক্রি হচ্ছে।’
আইনশৃঙ্খলা ও পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রশাসনও সক্রিয় রয়েছে। দুর্গাপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, রোগাক্রান্ত বা ক্ষতিকর উপায়ে মোটাতাজাকৃত পশু বিক্রি ঠেকাতে ভেটেরিনারি টিম কাজ করছে। দুর্গাপুর থানার ওসি পঞ্চনন্দ সরকার বলেন, ‘পশুর হাটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’
রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমান বলেন, ‘এ বছরও জেলায় চাহিদার তুলনায় প্রায় ৯১ হাজার ৯৫৩টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এসব পশু দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। আশা করছি খামারিরা ন্যায্য মূল্য পাবেন।’