গাজীপুরের টঙ্গীতে হঠাৎ করে বেড়েছে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যের ব্যবসা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিভিন্ন মাদকের চালান আসছে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে। কৌশলে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের হাতে। টঙ্গী বাজারসংলগ্ন হাজি মাজার বস্তি এখন মাদকের সবচেয়ে বড় আখড়া হিসেবে পরিচিত।
টিনের তৈরি ছোট ছোট ঘরে রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা প্রকাশ্যে চলছে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকের বেচাকেনা। শুধু হাজি মাজার বস্তি নয়, গাজীপুর মহানগরের ৩৩টি বস্তির মধ্যে টঙ্গীতেই রয়েছে ২৩টি বস্তি। টঙ্গীর ২৩টি বস্তিতে এখন মাদকের বড় বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে চলছে সংঘর্ষ। ঘটছে হতাহতের ঘটনাও। মাদক কারবারিদের উৎপাতে জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
টঙ্গীর মাজার বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, টঙ্গী বাজার এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে তুরাগ নদের তীরে অবস্থিত কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লাগোয়া মাজার বস্তিটি। বস্তিতে প্রবেশের শুরুতে প্রতিটি অলিগলিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে মাদক বিক্রেতারা। প্রথমে সংকেত দিয়ে বোঝানো হয় কী ধরনের মাদক সেবন করা হবে? পরে সেবনকারীকে নিয়ে যাওয়া হয় ভিন্ন ভিন্ন ঘরে। বস্তির প্রতিটি ঘরেই রয়েছে ছোট ছোট টিনের ঘর। বস্তির প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছে মাদকের আড্ডা।
স্থানীয়রা জানান, মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা বা চাঁদা নেন পুলিশ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। পুলিশের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে এ তথ্যও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন থানার ওসি মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায় করেন, যার একটি অংশ যায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পকেটেও।
ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণকারী রাজনৈতিক চক্রও বদলেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে এ কারবার নিয়ন্ত্রণ করতেন তৎকালীন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের অনুসারীরা। ক্ষমতা পরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতার হাতে। তবে এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নেতারা অস্বীকার করেছেন।
মাদকের আখড়াগুলোতে বহিরাগতদের প্রবেশ সহজ নয়। টঙ্গীর হাজি মাজার বস্তিতে সাংবাদিকরা গেলে তাদের ঘিরে ধরা হয় ও জেরা করা হয়। তাদের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে দেখা হয় কোনো ছবি বা ভিডিও ধারণ করা হয়েছে কি না এবং ভবিষ্যতে সেখানে আর না যাওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। স্থানীয়দের ভাষায়, এসব বস্তিতে অতিরিক্ত লোক রাখা হয় শুধু নজরদারির জন্য। প্রশাসনের লোক বা সাংবাদিক প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই চলে যায় তথ্য।
স্থানীয় লোকজন ও পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানের পর হাজি মাজার বস্তির মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন টঙ্গী পূর্ব থানা বিএনপির সভাপতি সুমন সরকার। টঙ্গী পশ্চিম থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি রাশেদুল ইসলাম জানান, সিদ্দিকুর রহমান ওরফে ডুবলি হাজি মাজার বস্তি নিয়ন্ত্রণ করেন, যিনি সুমন সরকারের লোক। তবে সুমন সরকার দাবি করেন, তার বা সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে মাদক কারবারের কোনো সম্পর্ক নেই।
হাজি মাজার বস্তির পর আরেক বড় আখড়া হলো এরশাদনগর বস্তি। এখানে মাদক ব্যবসা নিয়ে কোনো প্রতিবাদ হয় না। স্থানীয়দের মতে, প্রতিবাদ করলে প্রাণনাশের ভয় আছে।
কথা হয় ৩ নম্বর ব্লকের আকবর আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, আগের চেয়ে বর্তমানে মাদকের রমরমা ব্যবসা করে যাচ্ছেন কিছু লোক। নিয়ন্ত্রণ করছেন বিএনপি পরিচয়দানকারী কয়েকজন নেতা। এরশাদনগর বস্তিতে প্রকাশ্যে পুলিশ ডিউটি করলেও কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করছে না।
তিনি আরও জানান, টঙ্গীর প্রতিটি বস্তিতে মাদক ও সন্ত্রাসের আখড়া। এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য এবং রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানী নেতারাও জড়িত।
গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার বলেন, পুলিশ সিরিয়াস হলেই অপরাধ নির্মূল সম্ভব, নইলে নয়। তিনি আরও জানান, গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে বেশ কয়েকবার মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পুলিশ প্রশাসনকে আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে পুলিশের দাবি, তারা নিয়মিত অভিযান চালায় এবং মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করে। চলতি মাসে যোগদান করা নতুন জিএমপি কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বলেন, গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকার থানাগুলোর কোনো ওসির বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে ওই ওসিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হবে।
জিএমপি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী গাজীপুরে ৩৩টি বস্তিতেই রয়েছে মাদকের আখড়া। সেগুলো হলো কড়ইতলা বস্তি, কলাবাগান বস্তি, জিন্নাত মহল্লা বস্তি, নিশাত মহল্লা বস্তি, লাল মসজিদের পেছনের বস্তি, নামার মাজার বস্তি, ব্যাংগলের মাঠ বস্তি, মিল ব্যারাক বস্তি, ব্যাংকের মাঠ বস্তি, টঙ্গী স্টেশন বস্তি, আমতলী কেরানীটেক বস্তি, এরশাদনগর বস্তি, গাছা বস্তি, লক্ষ্মীপুরা, শিববাড়ী রেলগেট বস্তি, বরান, কোনাবাড়ী, টঙ্গী বোর্ডবাজার, ভোগড়া, সালনা, পুবাইল এবং কাশিমপুর কারাগারের পাশের বস্তি।
পুলিশের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে জিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) তাহেরুল হক চৌহান বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ জোরালো অভিযান চালাতে পারছে না। কারণ আগে মাদক কারবারিরা পুলিশকে ভয় পেলেও এখন আর পাত্তা দেয় না। তবু প্রতিদিনই মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তার চলছে।
এ বিষয়ে গাজীপুরের সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, বর্তমানে গাজীপুরে মাদকের কেনাবেচা রাত-দিন হচ্ছে। একসময় গোপনে মাদকদ্রব্য বিক্রি হতো, এখন প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে। তার মতে, পুলিশ সদর দপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমন্বিত অভিযানই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায়।