চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রথমবাবের মতো সবজির চালান গেল ফ্রান্সে। এতে ছিল মিষ্টিকুমড়া, কচুরমুখী ও তেঁতুল। পণ্যের চালানটি গত ৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজে তোলা হয়। এটি ফ্রান্সে পৌঁছবে আগামী ২২ জানুয়ারি।
এর আগে ইউরোপ, কানাডা, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গেলেও এই প্রথম ফ্রান্সে রপ্তানি শুরু হয়েছে।
এটি চলতি অর্থবছরের চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সবজির প্রথম চালান।
চট্টগ্রামের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ওয়াক অ্যান্ড এসএ লিমিটেড ১৩ হাজার ৭১০ টন সবজির রপ্তানি করছে ফ্রান্সে।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দর দিয়ে আকাশপথে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সবজি রপ্তানি হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে চট্টগ্রাম থেকে ৩৩ হাজার ৯২৪ টন সবজি রপ্তানি হয়েছে। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার ২০৩ দশমিক ৮৬ টন সবজি।
সেই হিসেবে বছরের ব্যবধানে সবজি রপ্তানির পরিমাণ কমেছে অর্ধেকের বেশি। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এক চালানেই ১৩ হাজার ৭১০ টন পণ্য গেছে ফ্রান্সে।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ফ্রান্সের উদ্দেশে এক কনটেইনার সবজির চালান জাহাজে তোলা হয়। ১৩ হাজার ৭১০ টনের এই চালানে রয়েছে- মিষ্টিকুমড়া ৭ হাজার ৪০০ টন, কচুরমুখী ৪ হাজার ৩৬০ টন, তেঁতুল ১ হাজার ৯৫০ টন।
বাড়তি দরে সবজি ক্রয় এবং সমুদ্র ও আকাশপথে পরিবহনে বাড়তি খরচের কারণে বিদেশে সবজি পাঠাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন রপ্তানিকারকরা। এ কারণে চট্টগ্রাম থেকে সবজি রপ্তানিতে ভাটা পড়েছে। বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে অর্ধেকেরও বেশি।
ফ্রান্সে রপ্তানি হওয়া এ চালানটি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পাঠানোর দায়িত্বে ছিল ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং অ্যাজেন্ট (সিঅ্যান্ডএফ) প্রতিষ্ঠান স্পিড লিংক লিমিটেড।
এ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার হাফিজুর রহমান মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, আমরা আগে আলু রপ্তানির কাজ করতাম সবচেয়ে বেশি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে আলু রপ্তানি নেই। এখন সবজি রপ্তানির কাজ পেয়েছি। ফ্রান্সের মতো দেশের সবজি রপ্তানি হচ্ছে এটা আমাদের দেশের জন্য ভালো খবর। কিন্তু এ রপ্তানি চলমান থাকতে হবে। মাঝপথে যেন বন্ধ হয়ে না যায়। চলমান থাকলে দেশের রাজস্ব বাড়বে। দেশের রপ্তানি আয় বাড়বে, ডলার সংকট আর থাকবে না।
ফ্রান্সে সবজি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ওয়াক অ্যান্ড এসএ লিমিটেডের ম্যানেজার (অপারেশন) মো. ইকবাল বাহার সৈকত খবরের কাগজকে বলেন, প্রথমবার সবজি রপ্তানি হয়েছে ফ্রান্সে। ৫ ডিসেম্বর জাহাজে তোলা হয় এই চালানের কনটেইনার। এটি আগামী ২২ জানুয়ারি ফ্রান্সে পৌঁছার কথা। এ চালান পাঠাতে নানা ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক মানের কোনো প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান নেই। আছে ঢাকায়। ফলে আমাদের পণ্য চালানটি ঢাকায় নিয়ে প্যাকেজিং করা সম্ভব ছিল না। বিশেষ ব্যবস্থায় প্যাকেজিং করা হয়েছে। এখন ভালোভাবে পণ্য চালানটি ফ্রান্সে পৌঁছালেই হলো। এ চালান পৌঁছানোর পর আবার অন্য চালান পাঠানো হবে। কারণ, এ চালানের ওপর পণ্য ভালো থাকা না থাকাসহ আমাদের অনেক কিছু নির্ভর করছে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি সবজির চাহিদা রয়েছে। তাই সবজি রপ্তানির পরিমাণও একসময় বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু দেশের কৃষকরা বাড়তি দরে সবজি বিক্রি করে। তার ওপর পাঠাতে গেলেও অন্যান্য দেশের তুলনায় গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। ফলে বাড়তি দরে সবজি ক্রয় এবং সমুদ্র ও আকাশপথে বাড়তি পরিবহন খরচের কারণে বিদেশে সবজি পাঠাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন রপ্তানিকারকরা। এতে গত বছর থেকে কমে যায় সবজি রপ্তানি।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের উদ্ভিদ কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তারা বলছেন, আগে রপ্তানিকারকরা আলু রপ্তানি করত সমুদ্রবন্দর দিয়ে। কিন্তু দুই বছর ধরে আলু রপ্তানি প্রায় শূন্যের কোঠায়। ফলে বিকল্প রপ্তানির চিন্তা থেকে সবজির দিকে নজর দিচ্ছেন রপ্তানিকারকরা। এতে স্থানীয় বাজারে সবজির দাম বেশি হওয়ায় কিছুটা আশা হারাচ্ছেন তারা। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে পরিবহনের অতিরিক্ত ভাড়া। তবে নতুনভাবে ফ্রান্সের মতো দেশে আমাদের সবজি যাচ্ছে, এতে আবারও আশার আলো দেখছেন রপ্তানিকারকরা।
সূত্রমতে, রপ্তানিকারকরা মূলত দেশের মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, নরসিংদী এবং চট্টগ্রামের চকরিয়া, পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানের কৃষকদের কাছ থেকে ভালো মানের সবজি সংগ্রহ করে থাকেন। রপ্তানিযোগ্য সবজির মধ্যে রয়েছে- শিম, বেগুন, টমেটো, ঝিঙা, পটোল, শসা, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাঁকরোল, বরবটি, কচুর লতিসহ নানা ধরনের সবজি। এবার নতুন যুক্ত হয়েছে কুমড়া।
এসব সবজি মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে ইউরোপের যুক্তরাজ্য, ইতালি, কানাডা, জার্মানি, সুইডেনসহ নানা দেশে সবজি রপ্তানি হয়।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধকেন্দ্রের উপপরিচালক মো. শাহ আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রথমবারের মতো কুমড়া, কচুরমুখী ও তেঁতুলের চালান ফ্রান্সে গেছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় সব রপ্তানি বৃদ্ধি করতে পারলে সরকারের জন্য ও ব্যবসায়ীদের জন্য মঙ্গলজনক হতো। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে রেফার কনটেইনারে সবজি রপ্তানি বাড়াতে পারলে দেশের রাজস্ব আয় বা বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি করা যেত। তবে আমদানিকারকের কাছে চালান পৌঁছাতে সময়সাপেক্ষ হওয়ার কারণে অনেকে আগ্রহ দেখান না। কিন্তু আমরা রপ্তানিকারকদের এ বিষয়ে উৎসাহিত করছি। তাই আকাশপথের পাশাপাশি চট্টগ্রাম, ঢাকার অনেক রপ্তানিকারক এখন চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে পণ্য পাঠাতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’
আবদুস সাত্তার/জোবাইদা/অমিয়/