বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠনের দেড় মাস পর আজ ৬ এপ্রিল, সোমবার প্রথম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা হচ্ছে। সেখানে ‘বাংলাদেশ সচিবালয়ে ২১ তলা নতুন অফিস ভবন’ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গিয়েছে।
এ ভবনটি ২০২৯ সালের জুনে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৬৪৯ কোটি টাকা। ভূমিকম্পের ঝুঁকি থাকায় বিদ্যমান ১ নম্বর ভবন ভেঙে এটি নির্মাণ করা হবে।
নির্বাচনি ইশতেহারকে গুরুত্ব দিয়ে নদী, খাল ও বিল রক্ষার প্রকল্পও থাকছে অনুমোদনের জন্য। গ্রামীণ সড়কের সঙ্গে ঢাকা শহরে জরুরি পানি সরবরাহসহ ১৭টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হচ্ছে। এ ছাড়া পরিকল্পনামন্ত্রী ইতোমধ্যে অনুমোদন দিয়েছেন এমন ৩৩টি প্রকল্পও একনেক সভাকে অবহিত করার জন্য উপস্থাপন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, দেশের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় প্রাঙ্গণে বেশি করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ও বিভাগের স্থান সংকুলনের জন্য সচিবালয়ে ২১ তলা নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সুষ্ঠুভাবে কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে গণপূর্ত অধিদপ্তর। নতুন ভবনের মাধ্যমে ২ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুট জায়গা সংকুলান করা হবে। বর্তমানে সচিবালয়ে অফিস স্পেস রয়েছে ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৭২ বর্গফুট। কিন্তু অতিরিক্ত চাহিদা রয়েছে আরও ৬ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুটের। প্রস্তাবিত ভবনটি নির্মাণ করা হলে চাহিদার প্রায় ৪২ শতাংশ পূরণ করা যাবে। নতুন এ ভবনে সচিবালয়ের বাইরে থাকা বিভিন্ন অফিসকে জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হবে।
নতুন ভবন প্রকল্পে যা থাকবে
২১ তলা ভবনের সঙ্গে ৪ তলা বেজমেন্ট করা হবে। সম্পূর্ণ সরকারি খরচে এ ভবন নির্মাণে ব্যয় হবে ৬৪৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। ভবনে ২৪০০ টনের বিশাল শীতাতপ ব্যবস্থায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ কোটি টাকা। আর ১৪টি লিফট ক্রয়ে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপণ ও চিহ্নিতকরণ ব্যবস্থা যুক্ত করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। সৌরবিদ্যুতে ব্যয় হবে ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ৫টি জেনারেটরে ব্যয় হবে ৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থায় ৩ কোটি ও আসবাবে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১৫ কোটি টাকা। ২টি বৈদেশিক প্রশিক্ষণে ৮০ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতায় যাবে ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
নতুন এ ভবনে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা থেকে শুরু করে অগ্নিনির্বাপণে অত্যাধুনিক সুবিধাসহ যুক্ত করা হবে নানা প্রযুক্তি। ভবনে ৬ যাত্রীবাহী, ৬টি ফায়ার লিফট, ২টি বেড লিফটসহ মোট ১৪টি লিফট থাকবে। ২ হাজার ৪০০ টনের কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকবে। স্বয়ংক্রিয় ফায়ার ডিটেকশন ও প্রটেকশনের ব্যবস্থা থাকবে। মাল্টিমিডিয়া সুবিধাসহ ২০টি কনফারেন্স রুম থাকবে। গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ৪টি বেজমেট থাকবে। ভবনে ভূগর্ভস্থ জলাধারে দেড় লাখ গ্যালন পানি সংরক্ষণ করা যাবে। প্রতি গ্যালনে প্রায় ৪ লিটার পানি থাকে। আর ভবনটিতে ১০ হাজার গ্যালন বৃষ্টির পানিও ধরে রাখা যাবে। বিদ্যুৎ সরবরাহে ২টি সাবস্টেশন ও ৫টি জেনারেটর থাকবে। পানি উত্তোলনে ১২টি পাম্প মোটর থাকবে। গাড়ি পার্কিংয়ে একটি আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবস্থা থাকবে। ৩২০ কিলোওয়াটের সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় কম্পিউটার-যন্ত্রপাতি ও আসবাবের সংস্থান রাখা হয়েছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে আসার পর গত বছরের ৪ সেপেম্বর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকল্পটি ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৯ সালের জুন সময়ে বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদিত ৩৩ প্রকল্পও অবহিত করা হবে
প্রথম একনেক সভায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ১৮ প্রকল্প উত্থাপন করা হবে। তালিকায় থাকা ১৭টি প্রকল্পের সঙ্গে টেবিলে উঠবে স্বাস্থ্য খাতের একটি প্রকল্প। এদের মধ্যে নতুন প্রকল্প রয়েছে ৮টি, বাকি ১০টি সংশোধিত ও সময় বৃদ্ধির প্রকল্প।
বিএনপি ভোটের আগে সারা দেশের খাল খনন ও উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেয়। তা আমলে নিয়ে প্রথম একনেক সভায় বাস্তবায়নে করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হচ্ছে। এটি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের জুনে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া পরিকল্পনামন্ত্রী হবিগঞ্জ জেলার সুতাং নদী পুনরুজ্জীবিতকরণ ও দূষণমুক্তকরণ, রাজশাহী ও নাটোর জেলার অন্তগর্ত বারনই নদী পুনঃখনন, দূষণমুক্ত ও দখলমুক্তকরণ, কক্সবাজার জেলার বাঁশখালী নদী পুনরুজ্জীবিত, দখলমুক্ত ও দূষণমুক্তকরণ এবং রংপুর জেলার আলাইকুড়ি নদী পুনরুজ্জীবিতকরণ প্রকল্পের যে অনুমোদন দিয়েছেন তা উপস্থাপন করা হচ্ছে।
এ ছাড়া অনুমোদনের জন্য গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম সিটির জলাশয় ও অবকাঠামো উন্নয়ন নতুন প্রকল্প থাকছে। তবে গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্প এবং শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন: দেশের ৮টি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রকল্পটিও সংশোধনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। মৎস্য খাতের উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়ে বিএনপি সরকার প্রথম একনেকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৫টি প্রকল্প উপস্থান করা হচ্ছে।