মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবারও খোলা ও ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশিদের জন্য আকর্ষণীয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি জুলাইয়ের মধ্যে খোলার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে মালয়েশিয়ার চাহিদার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় খোলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এবং ন্যায্য, নৈতিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ-প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে সম্মত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় বাংলাদেশ সরকার ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে শ্রম অভিবাসন বিষয়ে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ ও গঠনমূলক পরিবেশে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বৈঠকে শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা করেন।
বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা করতে এটি প্রথম সফর। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে বাংলাদেশ সরকারকে মানতে হবে কঠিন শর্ত। এ শর্তের পেছনে রয়েছে আগের সিন্ডিকেটেরই প্রতিচ্ছবি, যাদের প্রভাব থাকে দেশটির ক্ষমতাসীন দলেরই একটি অংশে। বৃহত্তর এ শ্রমবাজারটি খুলতে এবং বন্ধ করতে সিন্ডিকেটের কারসাজি চলে। প্রায় দুই দশক ধরে এ শ্রমবাজারটি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে চক্রটি।
মালয়েশিয়া সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মধ্যে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনেক পুরোনো। তারাই এ শ্রমবাজারটি নিয়ন্ত্রণ করে। এ সিন্ডিকেটের কারণেই বাংলাদেশি কর্মী নিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের নানা বিধিনিষেধের কবলে পড়েছে দেশটি। দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারণা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, অর্থ পাচারসহ নানা অভিযোগে একাধিক মামলাও রয়েছে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এসব মামলায় মালয়েশিয়ার দুর্বল শ্রম আইন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নানা প্রশ্নের মুখে পড়ে। এদিকে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে শ্রমবাজার নিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিশ্বাসযোগ্য এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর কথা বলা হয়েছে, যা আবারও নির্দিষ্টসংখ্যক এজেন্সির সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের বার্তা দেয়। পাশাপাশি শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠানোর কথাও বলা হয়েছে, যা বাস্তবায়ন দুরূহ ব্যাপার। যেখানে ৫-৬ গুণ বেশি টাকা নিয়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠান সিন্ডিকেটের সদস্যরা, সেখানে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠানোর কথা বলা হাস্যকর বটে। মূলত বিনা খরচের কথা বলেই বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারকে সিন্ডিকেট করার ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। চক্রটি কর্মীদের কাছ থেকে ঠিকই অতিরিক্ত টাকা নেবে এবং অধিকাংশ রিক্রুটিং এজেন্সি আগের মতো বৈষম্যের শিকার হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এবার আর আগের মতো নয়, নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় আসছে আমূল পরিবর্তন। মালয়েশিয়া সব দেশের কর্মীদের জন্য একটি প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, অভিবাসন ব্যয় হ্রাস করা এবং নিয়োগের যাবতীয় খরচ যাতে নিয়োগকর্তারাই বহন করেন তা নিশ্চিত করা। অভিবাসনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চললে আবারও পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হতে পারে। কারণ ওই চুক্তিতে যোগ্য এজেন্সি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা মালয়েশিয়াকে দেওয়া হয়েছিল। এটি হলে অতীতের সেই বিতর্কিত সিন্ডিকেটব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি হবে।
মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত। সেখানে বেতন-ভাতাদিও মোটামুটি সন্তোষজনক। কিন্তু কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি বারবার সংকটে পড়ছে। এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ থাকার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়েছে। নতুন করে আবার যখন শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ হয়েছে, সে ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের কবল থেকে মুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে।