চতুর্থ অধ্যায় : প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (৩২৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ)
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর-১
উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
গুপ্ত রাজাদের অধীনে বড় কোনো অঞ্চলের শাসনকর্তাকে বলা হতো 'মহাসামন্ত'। শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত রাজা মহাসেন গুপ্তের একজন মহাসামন্ত। একজন চৈনিক পরিব্রাজক তাকে বৌদ্ধধর্ম বিদ্বেষী বলে আখ্যায়িত করেন। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে তিনিই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম শাসক।
ক) সেন বংশের শাসকদের কী বলা হয়? ১
খ) কীভাবে মাৎস্যন্যায়ের অবসান হলো? ২
গ) উদ্দীপকে কোন রাজার কথা উল্লেখ করা হয়েছে? ব্যাখ্যা করো। ৩
ঘ) প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে তিনি প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম শাসক উক্তিটি যথার্থতা নিরূপণ করো। ৪
উত্তর: ক) সেন বংশের শাসকদের ‘সেনরাজ’ বলা হয়। তারা বাংলার ওপর প্রায় ১১৫৯ থেকে ১২২৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেছিলেন।
খ) মাৎস্যন্যায় বলতে সমাজে বিশৃঙ্খল অবস্থা ও আইনশৃঙ্খলার অনুপস্থিতিকে বোঝানো হয়। এটি ছিল এক ধরনের অব্যবস্থাপনা যেখানে শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর প্রভাব খাটাত। পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা গোপাল প্রথম এই মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটান। তিনি শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন, যা বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গ) উদ্দীপকে উল্লেখিত রাজার নাম শশাঙ্ক। তিনি গৌড় রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে একজন গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম শাসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শশাঙ্ক গুপ্ত রাজা মহাসেন গুপ্তের একজন সামন্ত থেকে স্বাধীন গৌড় রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলার প্রথম সার্বভৌম শাসক হিসেবে শশাঙ্কের অবদান ঐতিহাসিকভাবে অপরিসীম। তার শাসনামল বাংলার রাজনীতিতে স্বাধীনতার ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আসে। পরে পাল ও সেন রাজাদের সময়কালেও শশাঙ্কের প্রভাব লক্ষ করা যায়, কারণ তিনিই প্রথম শাসক যিনি বাংলায় একটি স্বাধীন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন এবং একে শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত করেন।
শশাঙ্কের ধর্মীয় নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে আলোচিত হয়। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের বিবরণ অনুযায়ী, শশাঙ্ক ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন। তিনি হিন্দু ধর্মের অনুরাগী ছিলেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন বলে জানা যায়। যদিও এই বিবরণ নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে, তবু শশাঙ্কের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি তার শাসনামলে বৌদ্ধ ধর্মের ওপর প্রভাব ফেলেছিল।
শশাঙ্ক প্রাচীন বাংলায় প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম শাসক হিসেবে পরিচিত। তিনি একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা পূর্বভারতে বাংলার রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি করে। তার সামরিক শক্তি এবং রাজনৈতিক কৌশল তাকে অন্য শাসকদের থেকে পৃথক করেছে। শশাঙ্কের শাসনকালে তার রাজ্য মগধ ও বর্তমান বাংলা অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল। শশাঙ্কের শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা এবং সামরিক ক্ষমতা পূর্ব ভারতে বাংলাকে এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করেছিল।
আরো পড়ুন : প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস অধ্যায়ের ২৯টি বহুনির্বাচনি প্রশ্নোত্তর, ৩য় পর্ব
ঘ) উদ্দীপকের উক্তিটি শশাঙ্কের ক্ষেত্রে যথার্থ। বাংলা তথা পূর্ব ভারতে শশাঙ্ক প্রথম স্বাধীন সার্বভৌম শাসক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার শাসনামলে গৌড় রাজ্য একটি শক্তিশালী ও সংগঠিত রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১. স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা: শশাঙ্ক ছিলেন একাধারে চৌকস শাসক ও রণকৌশলী। তিনি গুপ্ত রাজাদের অধীনস্থ সামন্ত থেকে নিজের স্বাধীন গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
২. ধর্মীয় নীতিতে কঠোরতা: শশাঙ্ক বৌদ্ধধর্মের প্রতি বিরূপ ছিলেন বলে হিউয়েন সাঙ উল্লেখ করেন। বলা হয়, তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ওপর নির্যাতন চালান এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার রোধ করতে চেষ্টা করেন।
৩. রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রসার: শশাঙ্ক পূর্ব ভারতে প্রথম শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তার সময়েই বাংলা অঞ্চল ভারতীয় রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
৪. ভূমি সম্প্রসারণ: শশাঙ্ক তার শাসনকালীন দক্ষিণাপথ থেকে শুরু করে মগধ পর্যন্ত বিস্তৃত ভূমি জয় করেন, যা বাংলার প্রথম রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
৫. ইতিহাসে প্রভাব: শশাঙ্কের ক্ষমতার প্রসার ও সাম্রাজ্যের বিস্তার বাংলার ঐতিহাসিক স্বাধীনতার পথ রচনা করেছিল, যা পরবর্তী সেন ও পাল রাজাদের রাজত্বকালে প্রভাব ফেলে।
সুতরাং শশাঙ্ককে বাংলার প্রথম স্বাধীন ও গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম শাসক বলা সংগতিপূর্ণ, কারণ তার শাসনামলেই প্রথমবারের মতো বাংলায় একটি সংগঠিত ও শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে।
লেখক : সহকারী শিক্ষক
সাভার অধরচন্দ্র সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
কবীর