আমাদের দেশে পত্রিকান্তরে নারী নির্যাতনের যে খবর প্রায়ই সামনে আসে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। এরই অংশ হিসেবে দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মামলার ক্রমবর্ধমান সংখ্যা নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। পরিসংখ্যান বলছে, নির্যাতনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এটি একটি গভীর সামাজিক সংকেত। উন্নয়ন ও অগ্রগতির নানা আলোচনার মধ্যেও এ বাস্তবতা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ একটি সমাজের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় তার সব নাগরিকের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, তার ওপর। সে জায়গায় আমরা যেন বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছি।
পুলিশের দেওয়া এক মাস আগের তথ্য বলছে, এক বছরে ধর্ষণের মামলা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে হওয়া মামলার সংখ্যাও বেড়েছে। এ সংখ্যাগুলো কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে একজন মানুষের কষ্ট, একটি পরিবারের দুঃখ এবং একটি সমাজের দায়। একটি মেয়ে বা শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি আমাদের সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।
২০২৫ সালে দেশে নারী নির্যাতনের প্রায় ২২ হাজার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাত হাজারের বেশি মামলা ধর্ষণের অভিযোগে। গড় হিসাবে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিযোগ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি, বাস্তব সংখ্যা হয়তো আরও বেশি। অনেক ঘটনা থানায় পৌঁছায় না। সামাজিক চাপ, পারিবারিক সংকোচ কিংবা অপমানের ভয় অনেককে নীরব থাকতে বাধ্য করে।
এই নীরবতাই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। অপরাধীরা তখন আরও সাহসী হয়ে ওঠে। তারা ধরে নেয়, শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়াবে না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অপরাধকে উৎসাহিত করে। ফলে সমাজে ভয় এবং অসহায়ত্বের অনুভূতি বাড়তে থাকে।
ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের দৃশ্য অনেক কিছুই বলে দেয়। আদালতের করিডরে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়। কেউ মেঝেতে বসে আছেন। কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেকের সঙ্গে স্বজন রয়েছে। আবার অনেকেই একা। তাদের চোখে ক্লান্তি। মুখে উদ্বেগের ছাপ। কেউ হয়তো প্রথমবার আদালতে এসেছেন। কেউ বছরের পর বছর ধরে একই পথে হাঁটছেন।
অনেক সময় আদালতের ভেতরে জায়গা হয় না। বিচারপ্রার্থীদের বাইরে বসে থাকতে হয়। কেউ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। কেউ উদ্বেগে আইনজীবীর দিকে তাকান। এই অপেক্ষা শুধু মামলার ডাকের জন্য নয়। এটি ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। অনেকের কাছে এটি মর্যাদা ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম।
আইন আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে। কিন্তু আইন থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। বাস্তবতা আরও জটিল। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে আইন কাগজেই থেকে যায়। তদন্তে ধীরগতি বা প্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা থাকলে মামলার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হলেও মামলা করতে পারেন না। পরিবার থেকে চাপ আসে। সমাজের ভয় থাকে। কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা সামনে আসে। তখন ভুক্তভোগীর পক্ষে এগিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় আপসের চাপ তৈরি হয়। কখনো অর্থের প্রলোভন দেওয়া হয়। কখনো আবার ভয় দেখানো হয়।
যেসব মামলা আদালতে আসে, সেগুলোরও দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারাধীন। অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এতে বিচারপ্রার্থীরা হতাশ হয়ে পড়েন। অনেক সময় দেখা যায়, মামলার তারিখের পর তারিখ পড়ছে। কিন্তু অগ্রগতি খুব কম।
বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে সাক্ষী পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকে দূরে সরে যান। কেউ ভয় পান। কেউ আর ঝামেলায় জড়াতে চান না। ফলে মামলার অগ্রগতি থমকে যায়। এতে বিচারব্যবস্থার প্রতিও মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মাঝেমধ্যে নৃশংস ঘটনার খবর সামনে আসে। কোথাও কিশোরী ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। কোথাও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কোথাও দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি ঘটনা সমাজকে নাড়া দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভও দেখা যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্ষোভ ম্লান হয়ে যায়।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, নারী নির্যাতনের পেছনে নানা কারণ কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক মানসিকতার সংকট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অনেক অপরাধী মনে করে শেষ পর্যন্ত তারা পার পেয়ে যাবে। এ ধারণাই অপরাধ করতে উৎসাহিত করে।
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন। নারীর প্রতি সম্মান এবং সমতার ধারণা পরিবার থেকেই গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এই দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মানবিক মূল্যবোধ শেখানো জরুরি।
গণমাধ্যমের দায়িত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নির্যাতনের ঘটনা সামনে আনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সমাজকে ভাবতে বাধ্য করাও প্রয়োজন। সংবাদ কেবল তথ্য দেয় না। এটি সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের অনেক ইতিবাচক উদাহরণ রয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশাসন এবং রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। একই সঙ্গে নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। নারী ও শিশু যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে উন্নয়নের সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজেরও দায় রয়েছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নির্যাতনের পর অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন হয়। এ সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে তারা দীর্ঘদিন মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়ান।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারী অধিকার কোনো স্লোগান নয়। এটি মৌলিক মানবাধিকার।
প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব এবং প্রত্যেক নারীর মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। এই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। এখন প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাহলেই পরিবর্তনের পথ তৈরি হবে।
লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক