প্রবন্ধ রচনা
(১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশের পর)
পরিবেশ দূষণ ও প্রতিকার
পানি দূষণ ও প্রতিক্রিয়া: বিশ্বে পানি মজুতের পরিমাণ ১৪১ বিলিয়ন ঘনমিটার, কিন্তু এর মাত্র ২ শতাংশ স্বাদু পানি। আবার এ পানির ৮ শতাংশ বরফ, হিমবাহ, ভূগর্ভে এবং আবহাওয়া মণ্ডলে বিভিন্নভাবে রয়েছে। মানুষের ব্যবহারের জন্য রয়েছে মাত্র ২ হাজার ঘন কিলোমিটার পানি, অথচ বাতাসের মতো সেই পানিও আজকাল নানাভাবে দূষিত হচ্ছে। বিভিন্ন শিল্প বর্জ্য, তরল পেট্রোলিয়াম, হ্যালোজেন বিষাক্ত হাইড্রোকার্বন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা, শহরে ড্রেন ও নালা-নর্দমা দিয়ে আসা দূষিত পানি প্রতিনিয়ত নদ-নদীতে গিয়ে পড়ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যাদি পানিতে দ্রবীভূত হয়েও পানি দূষিত হচ্ছে। এক দেশের শিল্প বর্জ্যজাতদ্রব্য অন্য দেশের সমুদ্রে ফেলার মাধ্যমে ওই দেশের সমুদ্রের পানি দূষিত হচ্ছে। সমুদ্রের পানি দূষিত হওয়ার অন্যতম কারণ তরল অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্যাদির পানিতে মিশ্রণ। উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাক ও কুয়েতের তেলক্ষেত্র থেকে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সমুদ্রের পানিতে মিশেছিল ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রের পানি ভীষণভাবে দূষিত হয়। মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তুর জন্য পানি অপরিহার্য। এ কারণে পানি দূষিত হলে সেই দূষিত পানি পান করে মানুষ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। নদ-নদী ও সমুদ্রের পানি দূষিত হলে শুধু মানুষই নয় বিভিন্ন জলজ প্রাণী ও মাছ আক্রান্ত হয় নানাবিধ রোগে। মাঝে মাঝে এসব রোগ মহামারি আকার ধারণ করে। এতে জনজীবনের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
শব্দ দূষণ ও তার প্রতিক্রিয়া: বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতায় শব্দ অপরিহার্য। কিন্তু শব্দের মাত্রা যখন তার স্বাভাবিকতা ছাড়িয়ে অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছায় তখনই শব্দ আর স্বাভাবিক শব্দ থাকে না বরং সেটা হয়ে যায় দূষণযুক্ত শব্দ। শহর, বন্দরে কলকারখানার বিকট আওয়াজ, মোটরযানের হর্ন, বাজি, পটকার শব্দ, রেডিও টেলিভিশনের শব্দ, মানুষের চেচামেচি, চিৎকার, উৎসব আনন্দের নামে হইহুল্লোড়, উচ্চৈঃস্বরে মাইক ও রেকর্ড প্লেয়ার বাজানো হয়। সব মিলিয়ে দেশে যেন শব্দদূষণের এক মহাযজ্ঞ চলছে। যেখানে শব্দের স্বাভাবিক মাত্রা হলো ২০ থেকে ৪০ ডেসিবল পর্যন্ত। সেখানে ঢাকা শহরে এখন শব্দের মাত্রার পরিমাণ ৫৫ থেকে ৬০ ডেসিবল কোথাও ৭৫ ডেসিবল। এ ধরনের উচ্চ শব্দের ফলে মানুষের জীবনে নানা রকম বিপর্যয় দেখা দেয়। যেমন- শ্রবণ শক্তির বিলোপ, মানসিক বিপর্যয়, উচ্চ রক্ত চাপ, অনিদ্রারোগ, হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি ও অস্থিরতা প্রভৃতি অস্বাভাবিক রোগ শব্দদূষণের পরিণাম।
আরো পড়ুন : পরিবেশ দূষণ ও প্রতিকার বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ১ম পর্ব
গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া: বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউজ গ্যাসের (কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, নাইট্রিক অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোর কার্বন ইত্যাদি) মাত্রা পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রকৃতি জগৎ এবং পরিবেশগত বিরূপ প্রতিক্রিয়াকে বলা হয় গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া। গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়ার প্রভাবে বর্তমান বিশ্বে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিরাট হুমকির সম্মুখীন। গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়ার কারণে পৃথিবীতে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে বরফ গলার পরিমাণ বাড়বে। তারই ফলশ্রুতিতে বাড়তে থাকবে সমুদ্রের পানি। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উপকূলবর্তী ও নিম্নাঞ্চল বা সাগরের দ্বীপ অঞ্চলগুলো তলিয়ে যাবে। ইতোমধ্যে পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে পৃথিবী থেকে ৭৬ রকমের প্রাণী ও কয়েক হাজার রকমের গাছপালা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ ছাড়া ১৩২ রকমের স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ২৬ রকমের প্রজাতির পাখির বংশ বিলুপ্তির পথে। সেই সঙ্গে বিশ্বের বহু স্থান মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। প্রতি বছর কলকারখানা ও যানবাহন থেকে ২০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়ে বাতাসে জমা হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে সুন্দর এই পৃথিবী সত্যি একদিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
পারমাণবিক বোমা ও পরিবেশ: বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেই এসেছে পারমাণবিক যুগ। কাঠ, কয়লা ও তেল দহনে বায়ুমণ্ডল যে পরিমাণে দূষিত হয়, পারমাণবিক দহনে পরিবেশ দূষিত হয়, তার চেয়ে লক্ষ গুণ বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল তার প্রবল প্রতিক্রিয়ায় সে অঞ্চল ও তার আশপাশের মানুষের এবং উদ্ভিদের সুস্থ থাকা ও অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। সেই ভয়াবহতার কথা স্মরণে রেখেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখনো চলছে পারমাণবিক বোমা বানানোর প্রতিযোগিতা। কয়েক বছর আগে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের দুর্ঘটনা ও তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার ভয়াবহতা মানুষ এখনো ভোগ করছে। এ ছাড়া রকেটের সাহায্যে মহাকাশ অভিযান ও উপগ্রহ উৎক্ষেপণে যে পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে তাতেও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
(বাকি অংশ আগামীকাল প্রকাশ করা হবে)
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা
কবীর