নবনীতা দেবসেন-এই নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক প্রাণখোলা হাসি, বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি আর শব্দের ভেতর দিয়ে জীবনের গভীরতম সত্যকে ছুঁয়ে দেখার এক অনন্য ক্ষমতা। তার হাসির মতোই ছিল তার লেখনী-স্বকীয়, সরস, কৌতুকময়, আবার প্রয়োজনমতো গভীরভাবে বেদনাহত। বহির্জীবনের পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি অনায়াসে পৌঁছে যেতেন অন্তর্জীবনের গোপন কুঠুরিতে; আত্মকথার আড়ালে আত্মউন্মোচন, আর হাসির অন্তঃসলিলা ধারায় অশ্রুর উপঢৌকন-এই ছিল তার লেখার চিরচেনা ভঙ্গি।
মানবমনের জটিলতম অনুভূতিগুলোকে তিনি কখনো ভারী তত্ত্বের বোঝায় চাপা দেননি। বরং ঠাট্টা-তামাশার ছলে, কৌতুকস্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গিতে ছুঁয়ে গেছেন প্রেম, বিচ্ছেদ, নিঃসঙ্গতা, নারীজীবনের সংকট, সামাজিক ভণ্ডামি। মেয়েদের কথা বলার ক্ষেত্রে তার কণ্ঠ ছিল স্পষ্ট, ঋজু এবং ভয়হীন। বাংলা সাহিত্যে এমন মুক্তমনা, বাগ্মী ও আত্মবিশ্বাসী নারীস্বরে কথা বলা লেখক আজও বিরল।
আজ নবনীতা দেবসেনের জন্মদিন। এই দিনটি আমার কাছে শুধু একজন মহৎ লেখিকার জন্মদিন নয়, বরং আমার ব্যক্তিগত জীবনের এক উজ্জ্বল স্মৃতির পুনরুজ্জীবন।
আমার সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় ১৯৯০ সালে, আমাদের বাড়িতেই-জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে। তখন আন্তর্জাতিক বইমেলা চলছে। প্রতি বছর অক্টোবর মাসে কলকাতা থেকে বইমেলায় আসতেন আনন্দ পাবলিশার্সের কর্ণধার, শ্রদ্ধেয় বাদল বসু। তিনি আমাদের বাড়িতেই অতিথি হতেন-সে এক নিয়মের মতোই ছিল। ১৯৯০ সালের বইমেলায় নবনীতা দেবসেন এসেছিলেন রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে। তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল ফ্রাঙ্কফুর্টের পাশের শহর মাইঞ্জ-এর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে।
বইমেলার দিনগুলো খুব ব্যস্ততায় কাটলেও, মেলা শেষে সন্ধ্যার নিস্তব্ধতায় মানুষের নিঃসঙ্গতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে-বিশেষত বিদেশের মাটিতে। সেদিন বইমেলাতেই বাদলদার কাছ থেকে আমাদের বাড়ির ফোন নম্বর নিয়েছিলেন নবনীতা দেবসেন। সন্ধ্যাবেলা আমরা কয়েকজন বন্ধু ও অতিথি মিলে ঘরোয়া আড্ডায় মেতে উঠেছি, এমন সময় ফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে ভেসে এল সেই পরিচিত অথচ তখনো আমার কাছে অচেনা কণ্ঠ-তিনি আমাদের বাসায় আসতে চান।
আমার আনন্দের সীমা রইল না। সঙ্গে সঙ্গে বললাম, “অবশ্যই চলে আসুন।” তখনই আমার বন্ধু, মাইঞ্জ শহরের অপু আলম-নবনীতা দেবসেনকে নিয়ে এলেন আমাদের বাড়িতে।
ভাবতে অবাক লাগছিল- হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করা, বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সাবেক স্ত্রী, অসংখ্য কবিতা, গল্প, উপন্যাসের স্রষ্টা সেই নবনীতা দেবসেন, যার লেখা আমরা পড়েছি, যাকে আমরা দূর থেকে জেনেছি-তিনি এখন আমাদের বাড়িতে, আমাদেরই আড্ডার একজন হয়ে বসেছেন।
প্রথম দেখাতেই আমার ভালো লেগে গেল তাকে। কোনো আড়ম্বর নেই, কোনো দূরত্ব নেই। সহজ, স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত। তার উপস্থিতিতে আমাদের আড্ডা যেন নতুন মাত্রা পেল। সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে শুরু হলো তুমুল আলোচনা-কবিতা, উপন্যাস, আত্মজীবনী, নারীবাদ, প্রবাসজীবন, ভাষার রাজনীতি, স্মৃতি আর বিস্মরণের টানাপোড়েন। তিনি কথা বলতেন এমনভাবে, যেন গল্প বলছেন-আবার সেই গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে থাকত তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ।
রাত গভীর হলো। কিন্তু তিনি আর হোটেলে ফিরলেন না। সেদিন আমাদের বাড়িতেই থেকে গেলেন। সে রাত আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ হয়ে রইল। যার বই পড়ে বড় হয়েছি, যার কবিতায় নিজের অনুভূতির ভাষা খুঁজে পেয়েছি, সেই মানুষটি আমার ছাদের নিচে-এ অনুভূতির সঙ্গে তুলনা চলে না।
এরপর আরও কয়েকবার তিনি ফ্রাঙ্কফুর্টে এসেছেন। তাকে নিয়ে আমরা রবি সন্ধ্যা পাঠচক্র থেকে অনুষ্ঠানও করেছি। মঞ্চে তিনি যেমন সাবলীল, তেমনি ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়ও ছিলেন অকপট ও রসিক। তার কথা বলার ভেতর ছিল আত্মবিশ্বাস, কিন্তু অহংকার নয়; ছিল প্রজ্ঞা, কিন্তু গাম্ভীর্যের ভার নয়।
নবনীতা দেবসেন তার নিজের নামেই একটি উপন্যাস লিখেছিলেন-নবনীতা। সেই উপন্যাসে তিনি আমাদের কথা উল্লেখ করেছেন-আমার, আর আমার বন্ধু অপুর কথা। একজন লেখকের কলমে নিজের নাম, নিজের অস্তিত্বকে এমনভাবে অমর হয়ে যেতে দেখা-এ আমার জীবনের আরেকটি অনন্য প্রাপ্তি।
আরও এক বিস্ময়কর তথ্য-নবনীতা দেবসেনের নামকরণ করেছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে। যেন নামের মধ্যেই তিনি বহন করছিলেন এক সাহিত্যিক উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকার তিনি শুধু বহনই করেননি, নিজের লেখনী দিয়ে তাকে সমৃদ্ধ করেছেন, বিস্তৃত করেছেন।
নবনীতা দেবসেন আমাদের শিখিয়েছেন-লেখা মানে শুধু শব্দের কারুকাজ নয়, লেখা মানে জীবনের সঙ্গে সৎ থাকা। নারীর জীবনকে তিনি দেখেছেন নিজের চোখ দিয়ে, নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে। তাই তার লেখা কখনো নকল মনে হয় না, কখনো আরোপিত লাগে না। তিনি হাসতে জানতেন, কাঁদতে জানতেন, আবার সেই হাসি-কান্নাকে সাহিত্যে রূপ দিতে জানতেন।
আজ তার জন্মদিনে আমি গভীর শ্রদ্ধা ও প্রণামে স্মরণ করি সেই মহীয়সী লেখিকাকে-যিনি আমাদের সাহিত্যকে দিয়েছেন সাহস, রস আর মানবিক গভীরতা। ব্যক্তিগত জীবনে যার সান্নিধ্য পেয়েছি, সেই স্মৃতি আজও আমার কাছে পরম পাওয়া হয়ে আছে।
নবনীতা দেবসেন নেই, কিন্তু তার হাসি আছে-লেখার পাতায় পাতায়, স্মৃতির অলিন্দে, আর আমাদের মতো পাঠকের হৃদয়ে। আজ তার জন্মদিনে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম