আজ ঘোষিত হবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে দৈনিক খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত বিজনেস এডিটর ফারজানা লাবনী
খবরের কাগজ: নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে কোন কোন বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু বিষয়ের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সে বিষয়গুলো বলার আগে তিনটি জিনিস উল্লেখ না করলেই নয়। প্রথমত: আমরা কোন পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি; দ্বিতীয়ত: ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং তৃতীয়ত: বর্তমানে সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন বাস্তবতা। মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের পরিবর্তে অন্যান্য ব্যবসার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে ক্ষয়িষ্ণু দশা। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। আমাদের তেল-গ্যাস-সারের বৃহদাংশ আমদানি করতে হয় মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি দিয়ে। একটা উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে পরিস্থিতিটা। যে ডিজেলের দাম ছিল ৮৮ মার্কিন ডলার, যুদ্ধ শুরুর পর সেটা দাঁড়াল ২৬৪ মার্কিন ডলারে। এলএনজির দাম হয়ে গেল দ্বিগুণেরও বেশি।
একটা ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী ও দুর্বল অর্থনীতির মধ্যে বসবাসরত সাধারণ জনগণের ওপর যখন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিঘাত এসে পড়ে, সেটি তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে। তবে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার যথাসম্ভব চেষ্টা করছে জ্বালানির মূল্য মানুষের ধরাছোঁয়ার মধ্যে রাখার। এজন্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে সবচেয়ে কম।
এবার আসি বাজেটের বিষয়ে: দশটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমরা বাজেট প্রণয়ন করছি। আমরা ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসব। এ বিষয়েও বাজেটে আলোকপাত করা হবে।
খবরের কাগজ: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতি চাপে আছে। বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে বাজেটে কী থাকছে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আমাদের অর্থনীতির সমস্যাগুলো একদিনে তৈরি হয়নি, যদিও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ নতুন। এই যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত সমস্যাগুলো অর্থনীতির পুরোনো দুর্বলতাগুলোকে আরও সংকটাপন্ন করেছে। আমরা মনে করি, এসবের সমাধানও করতে হবে, তবে সময় নিয়ে। আমি আগেই বলেছি অর্থনীতির সমস্যা এবং বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং জনগণের দুর্দশা সম্পর্কে সরকার সম্পূর্ণভাবে অবগত। এ কারণে আমরা অত্যন্ত স্বল্পমেয়াদে পরিকল্পিত কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। বর্তমান চলমান সংকট মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তার আওতা বৃদ্ধি করা হবে। এ ছাড়া, জনগণের যাতে অসুবিধা না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে জ্বালানির মূল্য সামান্য হারে সমন্বয় করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ নিম্ন ও মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যাদির ওপর কর-শুল্কের বোঝা ব্যাপকভাবে হ্রাস করা হবে। এ ছাড়া, স্বাস্থ্যবিষয়ক বেশকিছু পণ্য যেমন–কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর কর হ্রাস করা হবে।
খবরের কাগজ: আগামী বাজেটে করমুক্ত আয়সীমায় কি পরিবর্তন হবে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা হবে।
খবরের কাগজ: রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বাড়ানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার বেশি। আগামীতে এত বড় অঙ্কের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কী কৌশল গ্রহণ করেছেন?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: সরকার এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। রাজস্ব খাতে গভীর ও বিস্তৃত সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল বেস্ট প্র্যাকটিস অনুসরণ করে রাজস্ব নীতি ও প্রশাসনকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হবে। শুধু জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে নয় বরং একটি ন্যায্য, পূর্বানুমানযোগ্য, প্রযুক্তিনির্ভর ও সর্বজনীন করব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে বিনিয়োগ-উৎপাদন-কর্মসংস্থান-ভোগ-কর চক্রের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায়ে গতি আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
খবরের কাগজ: আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে সরকার কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: এ বিষয়ে সরকারের নীতি সোজাসাপ্টা। বিনিয়ন্ত্রণ এবং Ease of doing business বা ব্যবসা পরিচালনার সহজ সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে সরকার বদ্ধপরিকর এবং এটি করতে ব্যাপক খাতভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষতঃ বিনিয়োগ ও রাজস্ব খাতের বিভিন্ন স্তরে ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি দূর করতে এবং ব্যবসার ব্যয় হ্রাস করার জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন ছাড়পত্র এবং অনুমতি প্রদানের সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। এ সময়ের ভেতর কোনো সরকারি দপ্তর ছাড়পত্র বা অনুমতি দিতে ব্যর্থ হলে আবেদনকারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমতি পেয়ে যাবেন; একই দলিল বারবার দিতে হবে না; একই দপ্তর হতে সব অনুমতি বা ছাড়পত্র পাওয়ারও ব্যবস্থা করা হবে। রাজস্ব খাতে ব্যবসায়ীদের অনলাইন রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা করা, অডিটের জন্য কর মামলা নির্বাচনে অটোমেশন ইত্যাদিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে প্রস্তাব করা হবে।
খবরের কাগজ: বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকারের কতটা আগামী বাজেটে বাস্তবায়ন হবে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: বিএনপির যে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সেটি স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়ন হবে। আমরা যে অর্থনীতি পেয়েছি, দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই অর্থনীতি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এই অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সময় দিতে হবে। এটি এত সহজে হবে না। আমাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার এবং তার থেকে তৈরি পরিকল্পনা যা আমরা বাজেটে প্রতিফলিত করব, তা ব্যাপক এবং গভীর। এর মধ্যে যে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন কথা বলেছি, সেটি হলো বিনিয়ন্ত্রণ। এটি আপনার এই বাজেটেই দেখতে পাবেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আমাদের যে অঙ্গীকার, তা বাস্তবায়নের রূপরেখাও এই বাজেটে পাওয়া যাবে। ক্রিয়েটিভ ইকোনমির একটি বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন পরিকল্পনাও এই বাজেটের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। সুতরাং, আমাদের নির্বাচনি অঙ্গীকারের স্বল্পমেয়াদি বিষয়গুলো, যা এক বছরে বাস্তবায়নের কথা, সেগুলো ইতোমধ্যেই বেশকিছু আমরা করে ফেলেছি, যেমন: ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ ইত্যাদি। আমাদের ট্র্যাকরেকর্ড বলে বাকিগুলোও আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ইনশাআল্লাহ করে ফেলব।
খবরের কাগজ: আগামী বাজেটে শিক্ষা খাতে কতটা গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: এই বাজেটে শিক্ষা হবে সর্বাধিক গুরুত্বপ্রাপ্ত খাত। শিক্ষা হবে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, উদ্ভাবনী ও আনন্দময়। এর মানোন্নয়নে বিএনপি সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ বছর শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হবে জিডিপির ২ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ১.৩৯ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এ খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরে ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা।
খবরের কাগজ: আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সরকার কতটা গুরুত্ব বাড়িয়েছে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আগামী পাঁচ বছরে আমরা স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করব। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জিডিপির ১.০১ শতাংশ। আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে চিকিৎসাকেন্দ্রিক ধারা থেকে বেরিয়ে প্রতিরোধকেন্দ্রিক ধারায় যেতে চাই। আমরা স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দকে ব্যয় না বলে বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম বিনিয়োগ হিসেবে দেখছি।
খবরের কাগজ: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারে সরকারের নীতি কী? আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার কোন বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে? বাজেটে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে সরকার কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: সাধারণ মানুষের জন্য ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড চালু করা হয়েছে। সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তার আওতা বৃদ্ধি করা হবে। এ ছাড়া জনগণের যাতে অসুবিধা না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে জ্বালানির মূল্য সামান্য হারে সমন্বয় করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ নিম্ন-মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যদ্রব্যাদির ওপর কর-শুল্কের বোঝা ব্যাপকভাবে হ্রাস করা হবে। এ ছাড়া, স্বাস্থ্যবিষয়ক বেশকিছু পণ্য যেমন–কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর কর হ্রাস করা হবে।