ফেসবুক পেজটির দিনের কার্যক্রম শুরু হয় সকলকে ‘শুভ সকাল’ জানিয়ে। এরপর কখনো ধর্মীয় শুভেচ্ছা, কখনো-বা দুপুর, সন্ধ্যা কিংবা রাতের শুভরাত্রির পোস্ট দেখা যায় নিয়মিত। কিন্তু সাধারণ এসব পোস্টের ফাঁকে ফাঁকে প্রতিনিয়ত সেলিব্রিটি নারীদের ছবি-ভিডিও দাবি করে অসংখ্য ভুয়া কনটেন্ট প্রচার হচ্ছে। রিউমর স্ক্যানার ‘চলো বদলে যাই’ নামে এমন একটি ফেসবুক পেজের সন্ধান পেয়েছে যাতে পেজের নামের সঙ্গে মিল রেখে নিয়মিত নারীদের চেহারা বদলে দেওয়ার মিশন চলছে। আপত্তিকর কনটেন্টগুলোর কারণে হরহামেশাই বিরূপ মন্তব্যের শিকার হতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট নারীদের। পেজটির পেছনে যে ব্যক্তি রয়েছেন তিনি পঙ্গুত্ব বরণ করা গাজীপুরের এক ব্যক্তি।
চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল ‘চলো বদলে যাই’ নামের পেজটির সন্ধান পায় রিউমর স্ক্যানার। নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পাওয়া পেজটিতে সেদিন কিছু ছবি দিয়ে একটি পোস্টে দাবি করা হয়, ছবিগুলো ঢাকাই সিনেমার নায়িকা পরীমণির। পোস্টটিতে এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজারের অধিক রিয়েক্ট এবং প্রায় এক হাজারের অধিক কমেন্ট এসেছে। কমেন্টগুলোতে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুই ধরনের মন্তব্যই করেছেন নেটিজেনরা।
তবে পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নেতিবাচক কমেন্টের পরিমাণই বেশি এবং এর সিংহভাগই বডি শেমিং ধরনের।
রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখতে পায়, এগুলো পরীমণির ছবিই নয়। ভারতের হিমাচল প্রদেশের শিমলার এক ভিন্ন নারীর ছবির ওপর ফেস সোয়াপ প্রযুক্তির ব্যবহার করে পরীমণির মুখমণ্ডল বসিয়ে দাবিটি প্রচার করা হচ্ছিল। ফেস সোয়াপ এমন একটি প্রযুক্তি যেখানে এক ব্যক্তির মুখ অন্য কারও মুখের সঙ্গে ডিজিটালভাবে বদলে দেওয়া হয়।
এতে দেখা যায়, যেন প্রথম ব্যক্তি আসলে দ্বিতীয় ব্যক্তির মতো দেখাচ্ছে বা তার কাজ করছে। এই কাজটি সাধারণত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এআই টুলসের সহজলভ্যতার সুযোগে এর অপব্যবহারের দিকটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
তারই উদাহরণ হয়ে এসেছে ‘চলো বদলে যাই’ এর মতো পেজগুলো। এই পেজটি এপ্রিল থেকে নিয়মিত নজরদারিতে রেখেছিল রিউমর স্ক্যানার। পরবর্তী মাসগুলোতে পেজের বিভিন্ন পোস্টকে নিয়ে ফ্যাক্টচেকও করা হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পেজটির ৩৭টি পোস্টকে অপতথ্য হিসেবে শনাক্ত করে ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করেছে রিউমর স্ক্যানার।
আলোচিত এই পেজটি চালু করা হয় ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। শুরু থেকেই একই নাম অর্থাৎ ‘চলো বদলে যাই’ নামেই পরিচালিত হচ্ছে পেজটি। পেজটি বাংলাদেশ থেকে একজন এডমিনই পরিচালনা করছেন। পেজটির লোকেশন হিসেবে গাজীপুরের নাম উল্লেখ রয়েছে। ২৮ হাজার ফলোয়ারের পেজটি চালুর পর থেকেই নিয়মিত বিভিন্ন নারীর ছবি পোস্ট করা হচ্ছিল। অন্তত গেল বছর থেকে এআই ভিত্তিক ভুয়া ও সম্পাদিত কনটেন্ট প্রচারের বিষয়টি লক্ষ্য করা যায় পেজে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছর এটির পরিমাণ বাড়তে শুরু করে।
এই পেজটি নিয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, পেজটির উদ্যোক্তা হিসেবে ইমরান মিয়া নামে এক ব্যক্তি রয়েছেন। তার বাড়ি গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের সেনপাড়া গ্রামে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর এক ভিডিওতে তিনি নিজেই এসব তথ্য জানান। ভিডিওটি দেখুন এখানে। ভিডিওতে তিনি জানান, আজ থেকে ১৭ বছর আগে গাছ থেকে পড়ে গিয়ে তার গলার নিচ থেকে হাত-পা অবশ হয়ে যায়। তিনি এরপর থেকে কোনোরকম চলাফেরা করতে পারেন না। নিজের হাতে খেতেও পারেন না। ভিডিওতে তিনি এই পেজটি তার নিজের বলে দাবি করেন।
ইমরান রিউমর স্ক্যানারকে জানান, তিনি ইউটিউব ফেসবুক দেখে ছবি এবং ভিডিও এডিট করে পেজে আপলোড দিয়েছিলেন। কিছু অর্থ উপার্জন করতে চেয়েছিলেন। সেজন্যই ভিডিও আর ছবিগুলো সম্পাদনা করেছিলেন। তিনি বলছিলেন, “অনেকদিন ছবি আর ভিডিও এডিট করে পেজে পোস্ট করেছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত এক টাকা ইনকাম করতে পারি নাই। মনিটাইজেশনও পাই নাই।”
‘চলো বদলে যাই’ পেজটির কার্যক্রম পর্যালোচনা করতে গত আগস্টে প্রকাশিত পেজটির সকল পোস্ট বিশ্লেষণ করেছে রিউমর স্ক্যানার। এই এক মাসেই পেজে পোস্ট হয়েছে ২৩৮টি। আগস্টের প্রতিদিনই সর্বনিম্ন পাঁচটি থেকে সর্বোচ্চ ১১টি পোস্ট করা হয়েছে পেজে। এসব পোস্টের ১৩৫টি ছিল সাধারণ পোস্ট। বাকি পোস্টগুলোতে ছিল নারীদের নানা সাধারণ ও আপত্তিকর ছবি-ভিডিও।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভুয়া হিসেবে শনাক্ত হওয়া কনটেন্টগুলোতে সবচেয়ে বেশি জড়ানো হয়েছে বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনের নারী তারকাদের। ৩৬ জন নারীর মধ্যে ২৯ জনই বাংলাদেশের। এর মধ্যে ২৮ জনই বিনোদন তারকা। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছয়টি করে অপতথ্যের শিকার বানানো হয়েছে ছোট পর্দার দুই অভিনেত্রী তানজিম সাইয়ারা তটিনী ও তাসনিয়া ফারিণকে।
বাংলাদেশ ছাড়া ভারতের কলকাতার বিনোদন তারকাদের জড়িয়েও আটটি অপতথ্যের প্রচার দেখা গেছে পেজটিতে। আগস্টে টলিউডের নায়িকা নুসরাত জাহানকে জড়িয়ে দুটি অপতথ্যের প্রচার ছিল পেজে।
পেজটির আগস্টের কনটেন্টগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, ফারিণকে জড়িয়ে প্রচারিত দুইটি কনটেন্ট ভারতীয় নারী রাশি সিং এর ভিডিওকে সম্পাদনা করে বানানো হয়েছে। একইভাবে সাদিয়া আয়মানকে জড়িয়ে প্রচারিত দুইটি কনটেন্ট আরেক ভারতীয় নারী শায়রা জিলাওয়াত এর ভিডিওকে সম্পাদনা করে বানানো হয়েছে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, দিব্যিয়া পাচাল নামে ভারতীয় এক নারীর ছবিকে একবার আশনা হাবিব ভাবনা এবং আরেকবার মাহিয়া মাহি দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। সবমিলিয়ে, সে মাসে ৩৬ জন নারীকে জড়িয়ে যে ৭৯টি ভুয়া পোস্ট করা হয়েছে তাতে ৭৬ জন ভিন্ন ভিন্ন নারীর কনটেন্টকে সম্পাদনা করে অপপ্রচারের প্রমাণ মিলেছে।