প্রতিবছরের মতো এবারও এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এবার প্রতারণার ধরনে এসেছে নতুন মাত্রা। ফেসবুক গ্রুপ ও টেলিগ্রাম চ্যানেলকে কাজে লাগিয়ে পরীক্ষার্থীদের কাছে ‘ফাঁস হওয়া প্রশ্ন’ বিক্রির প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে ব্যবহার করা হচ্ছে এআই প্রযুক্তিতে সম্পাদিত প্রশ্নপত্রের ছবি। এরপর টেলিগ্রাম বটের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে টাকা।
রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই প্রতারণাচক্রে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর, টেলিগ্রাম বটের ইউজারনেম এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তারিখ ২৯ এপ্রিল, ২০২৬। চলমান এসএসসি পরীক্ষার মাঝেই পরদিনের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পরীক্ষাকে ঘিরে শুরু হয় নতুন ধরনের প্রতারণার তৎপরতা। ২৮ এপ্রিল দুপুর থেকেই ফেসবুকে ‘Ssc 2026 প্রশ্ন ফাঁস গ্রুপ’ নামের একটি গ্রুপে আইসিটি প্রশ্ন দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শেয়ার করা হচ্ছিল টেলিগ্রামের লিংক।
‘Raja Roy’ নামের একটি ভুয়া ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ২৯ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত এ–সংক্রান্ত মোট ১৭টি পোস্ট করা হয় গ্রুপটিতে। পোস্টগুলোতে দাবি করা হচ্ছিল, টেলিগ্রাম চ্যানেলে যোগ দিলেই পাওয়া যাবে পরীক্ষার প্রশ্ন।
তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রচারিত প্রশ্নের ছবিটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। ছবির বানান ভুল ও অস্বাভাবিক লেখার ধরন বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। আরও যাচাই করে রিউমর স্ক্যানার দেখতে পায়, ২০২৫ সালের এসএসসির আইসিটি প্রশ্নপত্রের ছবিকে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদনা করেই নতুন এই ভুয়া প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে।
ফেসবুকের পোস্টগুলোতে টেলিগ্রামের যে লিংক দেওয়া ছিল সেটি মূলত একটি চ্যানেল। টেলিগ্রাম চ্যানেলটির নাম SSC Question Sell। সাবস্ক্রাইবার ৩৮০০-এর বেশি। গত ২৭ এপ্রিল এটি খোলা হয়। সেদিনই ‘Ssc 2026 প্রশ্ন ফাঁস গ্রুপ’ নামের ফেসবুক গ্রুপটিতে চ্যানেলটির প্রচারণা শুরু হয় Raja Roy নামের ভুয়া প্রোফাইলটি থেকে। কিছুটা কৌশল নিয়ে প্রথমে প্রশ্ন চেয়ে পোস্ট করা হয় প্রোফাইলটি থেকে। কয়েক ঘণ্টা পর একই প্রোফাইল থেকে টেলিগ্রামের আলোচিত চ্যানেলটি থেকে প্রশ্ন পাওয়া গেছে জানিয়ে পোস্ট করা হয়। এরপর থেকে নিয়মিত এই প্রোফাইল টেলিগ্রাম চ্যানেলটির প্রচারণা চালিয়ে আসছে এই গ্রুপে।
২৭ এপ্রিল থেকেই সংশ্লিষ্ট টেলিগ্রাম চ্যানেলে বিভিন্ন বার্তার মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন পাওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছিল। বিশেষ করে ২৯ এপ্রিল, আইসিটি পরীক্ষার আগের পুরো দিনজুড়ে সেখানে ধারাবাহিকভাবে ‘প্রশ্ন দেওয়া হবে’ দাবি করে বার্তা প্রকাশ করা হয়।
এসব পোস্ট ও মেসেজে আইসিটি বিষয়ের এআই-সম্পাদিত ভুয়া প্রশ্নপত্রের ছবির একটি অংশ ব্যবহার করা হয়, যাতে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। একই সঙ্গে জানানো হয়, প্রশ্ন পেতে হলে ১০০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে এবং যোগাযোগ করতে হবে @Joyesh_Bot ইউজারনেমযুক্ত ‘Redwan’s_Method_Crackers’ নামের একটি টেলিগ্রাম বট আইডিতে।
রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের একজন প্রতিনিধি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ওই বট আইডিতে যোগাযোগ করলে প্রথমেই জানতে চাওয়া হয়- কোন শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্ন প্রয়োজন। প্রতিনিধি ঢাকা বোর্ডের কথা জানালে প্রতারক পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেদিন রাত ১০টায় একটি আলাদা প্রাইভেট গ্রুপে প্রশ্ন সরবরাহ করা হবে। এর বিনিময়ে দাবি করা হয় ৯০০ টাকা।
নম্বর চাওয়ার পর এই বিকাশ নম্বর (01718974531) দেওয়া হয়। রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট নম্বরটি বিভিন্ন মাধ্যমে যাচাই করে দেখেছে। ট্রু কলারে নম্বরটির বিপরীতে ‘Gour Sundor Kaku’ নাম পাওয়া যাচ্ছে। বিকাশে একই নম্বরের পরিচয়ধারী হিসেবে ‘Gour Sundar Biswas’ নাম রয়েছে। নিকনেম ব্যবহার হচ্ছে ‘Scammer 1’। সার্চ ইঞ্জিন গুগলের বদৌলতে একই নম্বর বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের ওয়েবসাইটে যশোরের সিদ্দিপাশা ইউনিয়নের পেজেও পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে এই নম্বরের বিপরীতে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা পদে থাকা গৌর সুন্দর বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ রয়েছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে মোবাইল নম্বরটির বিপরীতে সম্ভাব্য মাধ্যমগুলোয় একই নাম পাওয়ার প্রেক্ষিতে নম্বরটি ফেসবুকে সার্চ করে এই নামে একটি প্রোফাইল খুঁজে পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট।
যাচাই করে দেখা যায়, ‘গৌর সুন্দর বিশ্বাস’ নামের এই প্রোফাইলটি অন্তত ২০২২ সাল থেকে সক্রিয় রয়েছে ফেসবুকে। ওই বছর বিভিন্ন টিভি সিরিয়ালের লিংকের একটি গ্রুপের এডমিন হয়ে নিয়মিত সেখানে পোস্ট করা হতো।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে বিভিন্ন শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় দেখা যায় প্রোফাইলটিকে, নিয়মিত পোস্ট করা হতো পড়াশোনা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান চেয়ে।
এই প্রোফাইল থেকে শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্ম টেন মিনিট স্কুলের একটি ফেসবুক গ্রুপে ২০২৪ সালের এপ্রিলে করা একটি পোস্ট নজরে আসে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের, যাতে বলা হয়, পোস্টদাতার নাম জয়েশ বিশ্বাস (Joyesh Biswas)। তিনি নোয়াপাড়া শংকরপাশা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। ওই সময়ে সে নবম শ্রেণিতে পড়ছিল। এই পোস্টেও একই মোবাইল নম্বরটি দেওয়া ছিল।
নোয়াপাড়া শংকরপাশা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি যশোরের অভয়নগরে অবস্থিত। বিদ্যালয়টির ওয়েবসাইট থেকে তার পরিচয় নিশ্চিত হতে পেরেছে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট।
টেন মিনিট স্কুলের গ্রুপটি এবং আরেক শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্ম Redwan’s Method-এর একটি গ্রুপে গত বছরের ডিসেম্বরে জয়েশ তার এসএসসির টেস্ট পরীক্ষার একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্টের ছবি পোস্ট করে। এসব পোস্ট থেকে জানা যায়, জয়েশ এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে।
জয়েশের বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ফলাফল পর্যালোচনায় বোঝা যায়, সে মেধাবী একজন শিক্ষার্থী। তার ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল ঘেঁটে গেমিংয়ের নেশা থাকার বিষয়টি লক্ষ্য করা গেছে। তার সঙ্গে গৌর সুন্দর বিশ্বাসের সম্পর্কের বিষয়ে ওপেন সোর্স অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, টেলিগ্রামে বট প্রোফাইলটির ইউজার নেম তারই নামে এবং বটের নাম রাখা অনলাইনের একটি শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্মের নামে যেখানে সে নিজেও শিক্ষার্থী ছিল। যদিও এই অনুসন্ধান চলাকালীন এই নাম বদলে ফেলা হয়। বর্তমান নাম, ‘বাংলাদেশ শিক্ষাবোর্ড (Payment)।’
আজ রবিবার সকাল পর্যন্ত টেলিগ্রামের চ্যানেলটিতে এসএসসির ছয়টি বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁসের ভুয়া দাবি ছড়ানো হয়েছে। এসব প্রশ্ন পেতে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩০০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে। এমনও দেখা গেছে, একই বিষয়ের প্রশ্নের জন্য তিনবার তিন পরিমাণ (প্রথমে ২০০০, পরে ১২০০, সবশেষে ১০০০) অর্থ চাওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত মেসেজগুলোয় ব্যবহার করা হচ্ছে এআই দিয়ে সম্পাদনা করে তৈরি ভুয়া প্রশ্ন।
এসএসসির প্রশ্নফাঁসের গুজবকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার নতুন ও উদ্বেগজনক এই প্রবণতা দুশ্চিন্তার তৈরি করছে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে। এআই দিয়ে ভুয়া প্রশ্নের ছবি তৈরি, টেলিগ্রাম বট ব্যবহার করে অর্থ লেনদেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিত প্রচারণা-সব মিলিয়ে প্রতারকরা এখন আরও কৌশলী ও সংগঠিত হয়ে উঠছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে পরীক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিতও মিলছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতা ও অনলাইন প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিকে সামনে আনছে। পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগকে পুঁজি করে পরিচালিত এসব কার্যক্রম শুধু আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিই তৈরি করছে না, বরং শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষাপদ্ধতির প্রতি আস্থাও দুর্বল করে দিচ্ছে।