গত আট বছর দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি বলে সাংবাদিকদের কাছে যে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, তা ভুল বলছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার।
অনুসন্ধান করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশব্যাপী হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি হয়েছিল। ইউনিসেফের প্রবন্ধ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হয় এই তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানটি।
গতকাল (২৯ মার্চ) সাংবাদিকদের কাছে এক বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। এরপর আর এই ভ্যাকসিন কোনো গভর্নমেন্ট দেয় নাই। আমরা কিন্তু এর মধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। পারচেজ কমিটি পাশ হয়েছে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একাধিক প্রবন্ধ সামনে আসে।
২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হামের টিকাদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশে।
ইউনিসেফের প্রবন্ধে জানানো হয়, ‘সম্প্রতি দেশজুড়ে ৩ কোটি ৬০ লক্ষ শিশুকে হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়ার বিশাল কাজটি যারা সম্পন্ন করেছেন এমন হাজার হাজার বাংলাদেশি স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে ইয়োচুঙ্গু একজন। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার এই টিকা অভিযানটি সম্পন্ন করে।’
সেখানে আরও বলা হয়, ‘২০২০ সালের মার্চ মাসে এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এটি স্থগিত করা হয়। এমনকি ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একবার চালু করার পরে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ছিল যে, এবারের কার্যক্রম অন্যবারের চেয়ে ভিন্নতর হবে। অবশেষে টিকা দেওয়ার জায়গাগুলিতে ভিড় এড়াতে তিন সপ্তাহের পরিকল্পিত কার্যক্রমকে ছয় সপ্তাহব্যাপী চালানো হয়।’
এ বিষয়ে ফেসবুকেই ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারির মধ্যে অসংখ্য পোস্ট খুঁজে পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার, যেগুলোতে সেসময় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের আওতায় শিশুদের টিকা দেওয়ার সময়ের ছবিসহ আনুষ্ঠানিক তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি যে সত্য নয় তা স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা একটি জাতীয় দৈনিককে জানান, এটি সত্য নয়; টিকা ইপিআইয়ের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ এবং সব সময় দেওয়া হয়। নিয়মিত টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, তাই কয়েক বছর পরপর ক্যাম্পেইন করা হয়।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপ-পরিচালক মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘অনেক শিশু ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। তাই টিকাদানের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সর্বশেষ ২০২০ সালে ক্যাম্পেইন চালিয়েছে; ২০২৪ সালে করার পরিকল্পনা থাকলেও তা হয়নি। এপ্রিলে নতুন ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা রয়েছে। গ্যাভির সহায়তায় সারা দেশে হামের টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি চার বছর অন্তর ফলোআপ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়, যাতে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা যায়।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) বাইরেও বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে হামের টিকা পাওয়া যায়। সাধারণত বেসরকারি পর্যায়ে এমএমআর (মিজেলস, মাম্পস, রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়, যা হামের পাশাপাশি মাম্পস ও রুবেলা থেকেও সুরক্ষা দেয়। চলতি বছরও এমন টিকা দেওয়ার পোস্ট পাওয়া গেছে ফেসবুকে।
টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা বিভাগের (ইপিআই) নিজস্ব ড্যাশবোর্ড রয়েছে, যেখানে বছরভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ সংক্রান্ত ডাটাবেজ থেকে জানা যায়, অন্তত ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিবছরই এই টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে। এই হার কখনোই ৭০ শতাংশের নিচে নামেনি। তবে ২০২৫ সালের কোনো তথ্য এই ডাটাবেজে নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা বিভাগের (ইপিআই) নিজস্ব ড্যাশবোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হামের টিকাদান হার কখনোই ৮১ শতাংশের নিচে নামেনি। তবে ২০২৫ সালে এই হার দাঁড়িয়েছে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশে।
তবে টিকা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ড্যাশবোর্ডের তথ্য অসম্পূর্ণ।
অর্থাৎ, গত ৮ বছরে হামের টিকা সরকার দেয়নি বলে যে দাবি ছড়াচ্ছে তা সঠিক নয়। সুতরাং, গত আট বছরে দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের দাবিটি মিথ্যা।
অমিয়/