বর্ষা মানেই ভেজা ভেজা দিন, কাদা-পানি আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। এই সময়টাই আবার ভাইরাসজনিত নানা অসুখবিসুখেরও উৎকট মৌসুম। বিশেষ করে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় তারা সহজেই ভাইরাল ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়। তাই বর্ষায় শিশুর প্রতি যত্নশীল হওয়া অত্যন্ত জরুরি। লিখেছেন তাসকিন রোদসী
সবচেয়ে সাধারণ অসুখগুলো কী?
বর্ষাকালে শিশুরা যেসব ভাইরাসজনিত অসুখে বেশি ভোগে, তার মধ্যে রয়েছে সর্দি-কাশি, জ্বর, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ভাইরাল ডায়রিয়া, হাত-পা-মুখে ঘা হওয়া রোগ এবং ভাইরাসজনিত চোখের সংক্রমণ (কনজাংকটিভাইটিস)। ভেজা পরিবেশ, পানি জমে থাকা ও বদ্ধ জায়গায় ঘোরাফেরা এইসব সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
সুরক্ষার প্রথম ধাপ—পরিচ্ছন্নতা
শিশুকে প্রথমেই শিখাতে হবে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস। বিশেষ করে খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর কিংবা বাইরে থেকে ঘরে ঢোকার সময়। সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়া ভাইরাস ছড়ানো অনেকাংশে রোধ করে।
উষ্ণ জল দিয়ে গোসল শিশুর পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে শরীর শিথিল হয় এবং জীবাণু দূর হয়। অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান ও অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে। গোসল শেষে চুল ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া জরুরি, যাতে ঠান্ডা না লাগে।
এছাড়া শিশুর ব্যবহার্য জিনিস যেমন বোতল, খেলনা, পোশাক বা তোয়ালে নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। বৃষ্টি বা কাদা-পানিতে ভিজে গেলে দ্রুত শুকনো কাপড় পরে নিতে হবে এবং ভিজে পোশাক পরিবর্তন করতে হবে।
খাবারে যত্ন নিন
বর্ষাকালে পচনশীল ও খোলা খাবারে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই শিশুকে বাইরের ফাস্টফুড, অর্ধসেদ্ধ বা ঠান্ডা খাবার থেকে দূরে রাখা উচিত। এর পরিবর্তে ঘরে তৈরি গরম খাবার, পুষ্টিকর স্যুপ এবং পেঁপে, কলার মতো সহজপাচ্য ফল খাওয়ানো ভালো। স্বাস্থ্যকর খাবারই এই সময়ে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সবচেয়ে বেশি সহায়ক।
নিরাপদ পানি পান
শিশুর সুস্থতা বজায় রাখতে শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে তখনই, যখন পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ থাকে। বিশেষ করে বর্ষাকালে পানি দূষণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই দিনে অন্তত দুইবার ফুটানো পানি পান করানো অভ্যাস করুন। সিদ্ধ পানি শুধুমাত্র পিপাসা মেটায় না, এটি শিশুর দেহে জমে থাকা ক্ষতিকর জীবাণু দূর করে ও সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়।
বাসার পরিবেশ স্যাঁতসেঁতে নয়
বর্ষায় ঘরবাড়ি প্রায়ই আর্দ্র হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হতে পারে। তাই জানালা খোলা রেখে আলো-বাতাস চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে এক্সহস্ট ফ্যান বা ডিহিউমিডিফায়ার ব্যবহার করুন। এটি এমন একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র, যা ঘরের বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা শোষণ করে পরিবেশকে শুষ্ক ও স্বাস্থ্যকর রাখতে সাহায্য করে। এটি ছত্রাকজনিত সমস্যা ও অস্বাস্থ্যকর গন্ধ দূর করতেও কার্যকর।
এছাড়া বিছানা, বালিশ ও কুশন নিয়মিত রোদে শুকাতে দিন যাতে জীবাণুর সংক্রমণ কমে। শিশুর ঘরে যেন কোনোভাবেই জমে থাকা পানি না থাকে, তা খেয়াল রাখুন।
মশা থেকে সুরক্ষা
বর্ষাকালে জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন বাড়ে, যা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া বা ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি তৈরি করে। তাই শিশুকে বাইরে খেলতে পাঠানোর আগে অবশ্যই পূর্ণহাতা জামা পরান এবং মশা তাড়ানোর ক্রিম বা জেল ব্যবহার করুন। ঘরের আশপাশে যেন কোথাও পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করুন এবং রাতে মশারির ব্যবহার করুন।
বৃষ্টিতে ভিজলে সতর্ক হোন
বৃষ্টি উপভোগ করা শিশুর স্বাভাবিক আনন্দের অংশ। তবে ভিজে গেলে তাৎক্ষণিক গরম পানিতে গোসল করিয়ে শুকনো পোশাক পরিয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে গরম দুধ বা স্যুপ খাওয়ানো যেতে পারে শরীরের উষ্ণতা বজায় রাখতে।
চিকিৎসা বিলম্ব নয়
শিশুর যদি হঠাৎ কাশি, গলা ব্যথা, ঘন ঘন পায়খানা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া বা জ্বর দেখা দেয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেক সময় সাধারণ ভাইরাল ইনফেকশন জটিল রূপ নিতে পারে, তাই প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসাই সেরা উপায়।