যারা প্রকৃতি পছন্দ করে তারা সব সময় প্রকৃতির পেছনেই পড়ে থাকে। আমারও তেমন ইচ্ছা করে। তবে কাজ আর সময়ের জন্য সব সময় সেটা পারি না। তবে যখনই সময় পাই তখনই সেটা কাজে লাগাই। ঘড়ির কাঁটা বলছে রাত তখন সাড়ে ১০টা। সাইরেনের শব্দে বিদায় নিচ্ছি নগরী থেকে। ট্রেন রাতের অন্ধকার ভেদ করে দ্রুত চলে যাচ্ছে, আমাদের গন্তব্য সীতাকুণ্ড। পরদিন সকাল ৮টায় বৃষ্টি ভেজা চট্টগ্রাম স্টেশনে পা রাখলাম। শূন্য রাস্তায় খুব দ্রুত আমরা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলাম। পথের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে যখন আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, তখন মাত্র সূর্যিমামা উঁকি মারতে শুরু করলেন। সেই রাতে বাসা থেকে খেয়ে বের হয়েছি। পেটে আর কিছু পড়েনি।
কালক্ষেপণ না করে ঢুকে পড়লাম পেট পূজা করতে। গরম গরম পরোটা সঙ্গে ডাল আর সবজি খেতে যেন অমৃত লাগছিল। ও বলাই হলো না আজ আমরা চলছি সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণের নিমিত্তে। খাবার শেষ করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে সরাসরি চলে গেলাম সীতাকুণ্ড বাজারে। সেখান থেকে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়া চার কিলোমিটারের পথ। এবার তিন চাকার বাহন ছেড়ে দিয়ে আমরা পদব্রজে এগিয়ে যেতে লাগলাম। কারণ, বাজার থেকে রেললাইন পার হয়ে কিছুটা পথ এগোলেই শংকর মঠ শ্মশান, সীতামন্দির ধর্মশালা দেবালয়। তারপর আমরা চলে এলাম রাম-সীতা মন্দিরে। সীতাকুণ্ড জায়গার নামকরণে বিভিন্ন উপাখ্যান থাকলেও কথিত আছে, সীতার ব্যাস কুণ্ডলী থেকে সীতাকুণ্ড নামে পরিচিতি লাভ করে। তা দেখে আমরা চলে এলাম চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ওঠার গেটের মুখে। এখান থেকেই শুরু হলো আমাদের অভিযান। প্রবেশদ্বারের সামনের থেকে ২০ টাকার বিনিময়ে বাঁশের লাঠি ভাড়া করে নিলাম। খাড়া পাহাড়ে ভারসাম্য যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য এই বাঁশের লাঠি বেশ কার্যকরী।
যদিও পাহাড় থেকে নেমে আসার পর তা যদি নষ্ট বা ভেঙে না যায়, তবে ফেরত দিয়ে ১০ টাকা পেতে পারেন আপনি। পর্যাপ্ত পানি ও হালকা খাবার আমাদের সঙ্গেই ছিল। তাই এসব কেনার ঝামেলায় আর যেতে হয়নি। আর এখান থেকেই আমাদের মূল অভিযান পর্বের শুরু। পাহাড়ে ওঠার রাস্তা প্রথমে যেখানে শুরু, সেখানে মূলত পাহাড়ি রাস্তা কেটে সুন্দর ঢালাই করে নতুন রাস্তা বানানো হয়েছে। পাহাড়ে ওঠার শুরুর দিকে অনেকটা উঁচু পর্যন্ত ইট-সিমেন্টের ঢালাই করা রাস্তা। ঢালাই পথ পাড়ি দেওয়ার পর ছোট একটি ঝরনা দেখা যায়। মূলত এই ঝরনার কাছ থেকেই পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার আসল পথ শুরু। এখান থেকে দুটি পথ সিঁড়ি আকারে দুই দিকে চলে গেছে। বাঁ দিকের পথ দিয়ে চূড়ায় ওঠা তুলনামূলক সহজ। সবাই এই পথ দিয়েই ওপরে ওঠেন। অন্যদিকে ডান দিকের পথ দিয়ে চূড়া থেকে নিচে নেমে আসেন সবাই। বলছিল আমাদের ভ্রমণসঙ্গী আনন্দ। একে তো বর্ষাকাল, তার ওপরে ওই দিন ভোরে বৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণে ট্র্যাকিংয়ের সম্পূর্ণ পথটি কাদা ও পিচ্ছিল হয়ে আছে।
প্রথমবার যারা যান, তাদের সাধারণত ট্র্যাকিংয়ের পথের দূরত্ব নিয়ে তেমন ধারণা থাকে না। আমার ক্ষেত্রে যেমনটা হয়েছিল; ঝরনা পর্যন্ত গিয়ে মনে হলো হয়তো চূড়ার কাছাকাছি চলে এসেছি! এই ভেবে সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, তখন এক লোক বললেন, মাত্র ১০ শতাংশ ওপরে উঠেছেন! চূড়া পর্যন্ত যেতে আরও ৯০ শতাংশ পথ বাকি। এদিকে আমার ভ্রমণসঙ্গীরা সবাই পেছনে পড়ে যায়। নিচে যত দূর চোখ যায়, কাউকেই দেখা যাচ্ছিল না। মনে মনে বললাম, অপেক্ষা না করে ওপরে উঠতে থাকি। কিছুটা ওপরে ওঠার পর আবারও বিশ্রামের জন্য বসলাম। ভাবলাম, অন্যদের জন্যও অপেক্ষা করি। দেখি কেউ আসে কি না। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবার দেখা পেলাম সঙ্গীদের। পাহাড়ের যতই ওপরে উঠছি মনে হয় এখানেই পথ শেষ! ওঠার পর আরও পথ ধরে ওপরে উঠতে হয়। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে জেগে ওঠা ঘন সাদা কুয়াশা যেন আমাদের ডাকছে।
যেদিকেই চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। যেতে যেতে ওপরের দিকে তাকালে পাহাড়টাকে বিস্ময় মনে হয়। চারপাশ যেন সত্যিকারের আদিমতা ঘিরে রেখেছে পুরো প্রাকৃতিক রাজ্য। এগিয়ে যাচ্ছি ঘন জঙ্গল আর প্রাচীন বৃক্ষে ঢাকা সরু পথে। আমাদের মতো হাজার হাজার তীর্থযাত্রী চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় হেঁটে চলছে দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে। দূর থেকে ছোট ছোট টিলা পাহাড় দেখা যায়। অনিন্দ্য সুন্দরের এক আধার যেন পাহাড়টি ঘিরে রেখেছে। পথ যেন শেষই হচ্ছিল না। এদিকে পায়ের অবস্থা খারাপ, চলতে চাচ্ছে না। কাঁধের ব্যাগে যে জল ছিল, সেটাও শেষ হয়ে আসে। কিছুটা ওপরে ওঠার পর আবারও বিশ্রাম। সেখানে ছোট টংদোকান রয়েছে। আনন্দ এক বোতল জল কিনে নেয়। পুনরায় শুরু হলো যাত্রা। বেশিক্ষণ বিশ্রাম নিলে তখন আবার চলতে কষ্ট হবে। পা দুটি বলছিল, ‘আর না, আবার থামতে হবে।’ মন বলছিল, ‘থামা যাবে না। যত উঁচুতেই হোক, চূড়ায় উঠতেই হবে।’ সূর্যটা বড় আলসেমিতে পেয়েছে আজ। তেজ নেই। তবুও শরীর থেকে অনেক ঘাম ঝরছে। দেখা হলো কয়েকজন সাধু সন্ন্যাসীর সঙ্গে।
সন্ন্যাসীরা আরধনায় মগ্ন থাকে পাহাড়ে। পাহাড়ে ওঠার পথে দুপাশের প্রকৃতি পর্যটকদের মুগ্ধ করে। পথ চলতে চলতে পাহাড়ি পথে দেখা মিলবে প্রজাপতি আর মৌমাছির দলের ওড়াউড়ি। সামনেই প্রাচীন বটগাছের পাশে বিরুপাক্ষ মন্দির। আমরা এখানে আবারও কিছুটা সময় বিশ্রাম নিলাম আবার রওনা হলাম পাহাড়ের চূড়ার দিকে। এ বিরুপাক্ষ মন্দিরের পূর্ব দিকের পথ ধরে চলে গেছে চূড়ায়। এ সরু পথ ধরে চূড়ায় পৌঁছানো চ্যালেঞ্জিং। অনেক মানুষের ভিড় পেরিয়ে আমরা প্রায় আড়াই ঘণ্টা পথ অতিক্রম করে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছালাম। আমাদের ভ্রমণ যেন পূর্ণতা পেল। পাহাড়ের ওপরে ওঠার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আমাদের সেরা মুহূর্ত। গন্তব্যে পৌঁছার পর নিমিষেই হারিয়ে গেল ভ্রমণের সব ক্লান্তি।
পাহাড়ঘেরা নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার কথা মনে পড়ে যায়, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা অনুভব করছিলাম উঁচু-নিচু পাহাড়ের নির্জনতা। অদ্ভুত সুন্দর এ প্রকৃতি। প্রকৃতিকে কতটা রঙের তুলি দিয়ে তৈরি করেছেন বিধাতা তা পাহাড়ের বুকে না গেলে অনুভব করা যায় না। এখান থেকে দেখা যায়, তীর্থ যাত্রীদের পাহাড় বেয়ে চন্দ্রনাথ মন্দিরে ওঠার দৃশ্য। দূর থেকে দেখে অনেকটা মানুষের সারি পিঁপড়ার সারির মতো মনে হবে। চারপাশের আগরবাতির মহনীয় ঘ্রাণ আমাদের মোহিত করল। এক পাশে পাহাড় আর অন্য পাশে সমুদ্র। চন্দ্রনাথ পাহাড় জয় করে এবার ফেরার পালা আমাদের।
মনে মনে ভাবছিলাম একটু প্রসাদ পেলে মন্দ হতো না, তা ছাড়া পেটেও বেশ যুদ্ধ চলছে। সৃষ্টিকর্তা বোধহয় আমাদের কথা শুনলেন। অচেনা পথিক প্রসাদ নিয়ে এলেন আমাদের জন্য। সূর্য এখন মাঝ আকাশে এবার নামার পালা। ইট-পাথরের সিঁড়ি বেয়ে নামা শুরু করলাম। দুর্গম প্রান্তিক পাহাড়ি জনপদে সবুজ বন, বনফুল, প্রজাপতি আর নাম না জানা নানা ধরনের পাখির দেখা পেলাম ফিরতি পথে। বৃষ্টির কারণে সিঁড়িগুলো পিচ্ছিল ও কর্দমাক্ত হয়ে যায়। মনোযোগ একটু বিঘ্নিত হলেই বিপদ হওয়ার আশঙ্কা। পথও যেন শেষ হতে চাইছিল না। শেষ পর্যন্ত সমতল ভূমিতে যখন নেমে আসি, ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা প্রায় ২টা।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে এসি, নন-এসি বাস ছাড়ে। সব বাসই সীতাকুণ্ডে থামে। চট্টগ্রাম থেকে বাসগুলো মাদারবাড়ী, কদমতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে ছাড়ে। এ ছাড়া ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা দ্রুতগামী ট্রেন ‘ঢাকা মেইল’ সীতাকুণ্ডে থামে। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে অটোরিকশা জনপ্রতি ২০ টাকায় নামিয়ে দেবে পাহাড়ের প্রবেশ ফটকে। তা ছাড়া চট্টগ্রাম শহরে ট্রেনে করে এসে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে সিএনজি করে যেতে পারেন সীতাকুণ্ডে।