ষষ্ঠ পর্ব
প্রশাসন এবং পুলিশ খুবই ভালো কাজ করেছে। বিস্ময়কর মনে হয়েছে আমার কাছে।
তাই, বলিস কি! আনোয়ারা বেগম বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন।
মোহসীন আহমেদ বললেন, মোহিনী ঠিকই বলেছে। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরকারকে একেবারে ডুবিয়ে দিয়েছে। লোকটা কোনো কাজের না। কথাও বলতে পারে না ঠিকমতো। প্রধানমন্ত্রী না হলে যে কি হতো! মনে নেই এই লোক এর আগে কী করেছিল?
আনোয়ারা বেগম ও মোহিনী তাৎক্ষণিকভাবে মনে করতে পারছিলেন না। তারা মোহসীন আহমেদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মোহসীন আহমেদ বিরক্তির ভঙ্গিতে বললেন, তোমরা সব ভুলে যাও। গত বছর ডেঙ্গুর প্রকোপে ঢাকার নাস্তানাবুদ অবস্থা ছিল। সেই সময় সে স্ত্রীকে নিয়ে বিদেশে চলে গিয়েছিল না! এই খবর মিডিয়ায় আসার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তাকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। লোকটা কিছু বলে মনে হয় না।
মোহিনী বললেন, আমারও তাই ধারণা। টিভিতে তার কথাবার্তা শুনি তো! আমার কাছে লোকটাকে ভাঁড়ের মতো মনে হয়। কী বলে না বলে!
বাদও তো দেয় না। আনোয়ারা বেগম বললেন।
মোহসীন আহমেদ বললেন, আমাদের দেশে মন্ত্রিত্ব একবার পেলে কেউ আর ছাড়তে চায় না। আচ্ছা, আমাদের কথায় আবার ফিরে আসি। আনোয়ারা এবার তুমি বলো, আমরা যেভাবে চালাচ্ছি। মানে করোনার সময় কারও কোনো কাজ নেই। কিন্তু বেতন দিয়ে যাচ্ছি। এটা কি ঠিক আছে? নাকি বেতন কমিয়ে দেব!
আপাতত থাক। ডিসেম্বর পর্যন্ত যেভাবে আছে সেভাবেই চলুক। এর পরও যদি করোনা অব্যাহত থাকে তখন বেতন কমানোর কথা চিন্তা কোরো।
মোহিনী, তোমার কী মত? মোহসীন আহমেদ জানতে চাইলেন।
আমিও মা’র বক্তব্যের সঙ্গে একমত।
মোহসীন আহমেদ বললেন, তাহলে এটাই সিদ্ধান্ত। আমরা ডিসেম্বর পর্যন্ত বেতন দিয়ে যাব। এর পরও করোনা থাকলে বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নেব।
আনোয়ারা বেগম ও মোহিনী সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। মোহসীন আহমেদ আনোয়ারা বেগমকে উদ্দেশ করে বললেন, তোমার সুচিন্তিত মতামতের জন্য ধন্যবাদ।
মোহিনী মুচকি হাসলেন। তার পর নিজের কক্ষের দিকে চলে গেল। আনোয়ারা বেগমও উঠে চলে যান। মোহসীন আহমেদ ব্যক্তিগত নোটবই বের করে সিদ্ধান্তটি লিখে রাখলেন।
বিকেলে নিজের কক্ষে শুয়ে শুয়ে গান শুনছেন মোহিনী। রবীন্দ্রসংগীত তার বড় প্রিয়। আরও প্রিয় জয়তী চক্রবর্তীর কণ্ঠে যখন এই গানটি শোনে।
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে।
হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে
হৃদয়ে রয়েছ গোপনে হে।
আহা! কী দরদ দিয়ে যে জয়তী গানটি গেয়েছেন চিন্তাই করা যায় না। গানটি যে মোহিনী কতবার শুনেছেন! যত শোনেন ততই শুনতে ইচ্ছা করে। একেবারে হৃদয় ছুঁয়ে যায়। গান শুনতে শুনতেই তার মনে পড়ে শাহবাজ খানের কথা। কিশোরী বয়সের ভালোলাগা, ভালোবাসা। কখন ভালো লেগেছিল আবার কখন সেই ভালোবাসা নিমিষেই বিলীন হয়ে গেল বুঝতেই পারলেন না। তার পর কেটে গেল অনেক বছর।
হঠাৎ একদিন শাহবাজ মোহিনীর অফিসে এসে হাজির। মোহিনী ভূত দেখার মতো তাকে দেখছেন। কিছুই বলছেন না। এতদিন পর এলেন অথচ ও তাকে বসতেও বলছেন না! তার পর তিনি শাহবাজের মুখে শুনলেন, আমি এখনো তোমাকে ভুলতে পারছি না মোহিনী। অনেক চেষ্টা করেছি। মা-বাবার ইচ্ছায় বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করেছি। তাও প্রায় পনেরো বছর কেটে গেছে। অথচ স্ত্রীকে ঠিক ভালোবাসার মানুষ হিসেবে পাইনি। সব সময় ভাবতাম, সে তোমার মতো হবে। কিন্তু না। সে কিছুতেই তোমার মতো নয়। অবশ্য সে তো অন্য একটা মেয়ে। তোমার মতো হবে কি করে! কী হলো মোহিনী? কিছু বলো!
মোহিনী শাহবাজের কথাগুলো চোখ বন্ধ করে শুনলেন শুধু। কিছুক্ষণ সময় নিলেন। তার পর তিনি হা হা হা করে হাসলেন।
শাহবাজ বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, তুমি হাসছ! হ্যাঁ হাসবেই তো। এই বয়সে আমার ছেলেমানুষি সাজে না। অথচ তোমাকে দেখে আমি সেই কিশোর বয়সে চলে গেছি! সত্যি বলছি। বিশ্বাস করো।
মোহিনী আবার হাসলেন। হা হা হা।
তার পর পাগলের মতো আরও কিছু কথা বলে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় শুধু বললেন, আমি আবার আসব।
মোহিনী বিস্ময়ের সঙ্গে শাহবাজ খানকে দেখেন। আর মনে মনে বলেন, সত্যিই সে পাগল হয়ে গেল!
শাহবাজ খান আবারও মোহিনীর কাছে এলেন। আবারও বললেন, আমি তোমাকে ভালোবাসি মোহিনী! তোমার কথা আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। কিছুতেই না। তুমিই বলে দাও আমি কি করব!
শাহবাজ খানের কথাগুলো বারবার মোহিনীর মনে পড়ে। তিনি মনে মনে ভাবেন, ও কেন আবার অতীতে ফিরতে চায়? কী হবে অতীতে ফিরে গিয়ে? কিশোর বয়সে কতজনকেই তো ভালো লাগে। সবাইকে কি জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়া যায়! যে জীবন শুরুই হয়নি; সে জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ কোথায়! তাছাড়া ওর তো একটা সংসার আছে! সেখানে আমি কেন? না না! এ হয় না! শাহবাজ ভুল করছে। ভুল পথে পা বাড়িয়েছে। আমার জন্য তিন তিনটি জীবন বিপন্ন হতে পারে না। আমি অতটা অমানবিক হতে পারব না।
শাহবাজের নামটা তার মন থেকে মুছে ফেলতে চান মোহিনী। কিন্তু ইচ্ছা করলেই কি আর সবকিছু মুছে ফেলা যায়!
৬
শাহবাজ খান পাগলের মতো ছোটাছুটি করেন। তিনি কখনো নিবিড় পরিচর্যা কেন্দের সামনে যান। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। চোখ বন্ধ করে স্ত্রীর কথা ভাবেন। তার চোখের সামনে নানা স্মৃতি ভেসে ওঠে। তিনি আবেগাপ্লুত হন। মনে মনে বলেন, নীলিমা আমার জীবন থেকে চলে যাবে! কেন যাবে? এত অভিমান কেন হলো ওর? আমি কি খুব অবিচার করেছি? আমি কি ওকে ঠকিয়েছি? না তো! আমি কেবল আমার ছোটবেলার বান্ধবীর সঙ্গে সম্পর্ক ঝালাই করতে গিয়েছি। আর তো কিছু করিনি। নীলিমা কী ভেবেছে, আমি পরকীয়ায় জড়িয়েছি! নাকি নীলিমাকে কেউ প্ররোচিত করেছে? নিশ্চয়ই ভুল বুঝেছে নীলিমা। বড্ড অভিমানী মেয়ে সে। আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। আমার সঙ্গে অন্য কোনো মেয়ের বন্ধুত্ব কিছুতেই সে মানতে পারে না। সন্দেহবাতিকও তার বেশ প্রবল। যদি অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে যাই! সেই ভয়ে সে সব সময় তটস্থ থাকে।
শাহবাজ খান নিজেকেই নিজে দোষারোপ করেন। আমি কেন তাকে বুঝতে পারলাম না। সে একটা ভুল ধারণা নিজের ভেতরে পুষে রাখল! আর আমি কিছুই টের পেলাম না! এটা আমার অযোগ্যতা। আমি স্বামী হিসেবে ব্যর্থ। স্ত্রীর মন বুঝতে পারলাম না। কেন তার ভেতরের যন্ত্রণা আঁচ করতে পারলাম না!
শাহবাজ খান চিকিৎসক দলের প্রধানের কক্ষে গিয়ে আকুল ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেন, ডাক্তার সাহেব রোগী বাঁচবে তো! আমি কিচ্ছু জানি না ডাক্তার সাহেব! আপনি যে করেই হোক রোগীকে বাঁচান! যত টাকা লাগুক। আমি আমার সব সম্পদের বিনিময়েও যদি আমার স্ত্রীকে ফিরে পাই; তাহলে আমি সেটাই চাই। ওকে বাঁচাতে না পারলে আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে। আমার সাজানো সংসার তছনছ হয়ে যাবে। আমার সন্তান দুটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাবে। আমি ওদের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। হু হু করে কান্না আসে। ডাক্তার সাহেব আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন!
চলবে...
আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন-