কাজী নজরুল ইসলামের
তারুণ্য ও যৌবনপ্রীতি, অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, সংস্কারমুক্ত মন ও মনন এবং সার্থক সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভ ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর প্রবক্তাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। তখনকার দিনে নজরুলই ছিলেন বাঙালি মুসলমান সমাজের সবচেয়ে বড় আইকন। তিনি নিজে যেমন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে প্রেরণা জুগিয়েছেন, তেমনি গোঁড়া মুসলমানদের কাছে ‘কাফের’
উপাধি পাওয়া নজরুল এ আন্দোলনের সারথিদের কাছ থেকেও লাভ করেছেন শক্তি-সাহস
ও নব-উদ্দীপনা।…
ব্রিটিশ সরকারের রাজকীয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ঢাকার বুকে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হল মিলনায়তনে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’। এটি প্রতিষ্ঠায় যুক্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষক আবুল হুসেন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক কাজী মোতাহার হোসেন; ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের শিক্ষক কাজী আবদুল ওদুদ এবং উভয় প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষার্থী আবদুল কাদির, আনোয়ারুল কাদির, আবুল ফজল প্রমুখ। পশ্চাৎপদ মুসলমান সমাজকে যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি; সব দিক থেকে জাগিয়ে তোলাই ছিল এ সংগঠনের লক্ষ্য। উনিশ শতকের কলকাতায় ডিরোজিও যেমন ‘ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন’-এর মাধ্যমে সেখানকার হিন্দু সমাজে জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন, ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর সভ্যগণও তেমনি ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর মাধ্যমে ঢাকার মুসলমান সমাজকে জাগ্রত করার প্রচেষ্টা চালান। এ কাজে তারা প্রেরণা লাভ করেন জগদ্বিখ্যাত মনীষী, রাষ্ট্রনায়ক ও চিন্তাবিদদের [হজরত মোহাম্মদ (সা.), খলিফা আল মনসুর, ডিরোজিও, রামমোহন রায়, কামাল আতাতুর্ক, রোমা রোলাঁ, গ্যেটে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ] চিন্তা, কর্ম ও ভাবাদর্শ থেকে। ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ পরিচালিত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। এ ক্ষেত্রে তার দুই ধরনের ভূমিকার কথা জানা যায়; এক. পরোক্ষ ভূমিকা; যাতে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের পুরোধাগণ নজরুলের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন; দুই. তিনি প্রত্যক্ষভাবে মুসলিম সাহিত্য-সমাজের একাধিক সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে বক্তৃতা প্রদান, কবিতা আবৃত্তি ও গান পরিবেশনের মাধ্যমে আন্দোলন-সংশ্লিষ্টদের প্রেরণা দেন এবং সাহস জোগান।
দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণে পর্যুদস্ত হয়ে বাংলার মুসলমান সমাজ নানা দিক থেকে পিছিয়ে পড়লে সৈয়দ আহমদ খান, নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলীসহ কতিপয় চিন্তাবিদ যুগের বাস্তবতা মেনে তাদের জাগিয়ে তোলার প্রয়াস চালান। মুসলমান সমাজের গোঁড়ামি, অন্ধ বিশ্বাস, ধর্মান্ধতাসহ নানা সংস্কার-কুসংস্কার দূরীভূত করে রেনেসাঁসের মন্ত্রে জাগ্রত করতে কাজী নজরুল ইসলামও এগিয়ে আসেন। তার কবিতা, প্রবন্ধ ও অভিভাষণের ছত্রে ছত্রে রয়েছে এর অমোঘমন্ত্র। নজরুল তার ‘লাঙল’ পত্রিকায় অর্থনৈতিক-সামাজিক মুক্তির যে ডাক দিয়েছিলেন, তা মুসলিম সাহিত্য-সমাজের সভ্যদের বিশেষভাবে উজ্জীবিত করেছিল। এ আন্দোলনের অন্যতম কুশীলব আবদুল কাদির এক সাক্ষাৎকারে এ কথা স্বীকার করেছেন। ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ প্রতিষ্ঠার আগে-পরে নজরুলের সঙ্গে তাদের একাধিক পত্রবিনিময় হয়, যাতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাংলার অশিক্ষিত মুসলমানরা গোঁড়া এবং শিক্ষিত মুসলমানরা ঈর্ষাপরায়ণ।’ নজরুলের এসব পত্রালাপে মুসলিম সমাজের গতিহীন ও সংস্কারাচ্ছন্ন রূপের চিত্র ফুটে ওঠে। মুসলিম সাহিত্য-সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত চিন্তাবিদ ও কর্মকুশলীরা মুসলমান সমাজকে এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। তাদের জীবন ও কর্মধারাকে গতিশীল ও সংস্কারমুক্ত করার লক্ষ্যে তারা নানা প্রয়াস চালান। এ কাজে কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন তাদের বড় অনুপ্রেরক।
যুগের যে জাগরণী ধ্বনি ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল, তা নজরুল অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই এর প্রথম বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘যে গান আমি গাঁথব, তার সুর যে আপনাদের মনের বেণুকুঞ্জে।’ অর্থাৎ এই ভাবুকদের মনে মুসলমান সমাজকে জাগ্রত করার যে এষণা জেগেছিল, তা নজরুল নিজেও উপলব্ধি করেছিলেন। একথা লিখেই তিনি ক্ষান্ত হননি, প্রাণের টানে উপস্থিত হয়েছেন মুসলিম সাহিত্য-সমাজের বার্ষিক সম্মেলনে। ১৯২৭ সালের ২৭ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য-সমাজের প্রথম সম্মেলনে নজরুল যোগদান করে ‘খোশ আমদেদ’ গান পরিবেশন ও একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। পরের বছর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে তিনি উপস্থিত হন এবং এর উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অধিবেশনে পরিবেশন করেন তার ‘নতুনের গান’ শীর্ষক গানটি। ‘খোশ আমদেদ’ গানে তিনি মুসলিম জাগরণের অগ্রণী পুরুষ তরুণ হারুন-আল-রশীদ, আল-বেরুনি, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, ইমরুল কায়েস, ইমাম গাজ্জালী প্রমুখের ভাবাদর্শে মুসলমানদের জেগে ওঠার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘নবীনের আসার পথে উজাড় করে দে ফুল ডালি’। ‘নতুনের গানে’ নবজীবনের আবাহন জানিয়ে লেখেন- ‘চলরে নওজোয়ান-/ শোন্রে পাতিয়া কান/ নয়া জামানার মিনারে মিনারে/ নব ঊষার আজান।/ ভাঙ্রে ভাঙ্ আগল।/ চল্রে চল্রে চল্’।
নজরুল মুসলিম জগতের বীর ও নায়কদের নিয়ে উদ্দীপনামূলক কবিতা রচনা করেছেন। কামাল আতাতুর্ক, আনোয়ার তখনকার মুসলিম বিশ্বের অনুকরণীয় নেতা ছিলেন। কামাল আতাতুর্ককে তিনি ‘পাগলী মায়ের দামাল ছেলে’ বলে অভিহিত করে তার জয়গান গেয়েছেন। মুসলিম সাহিত্য-সমাজের ভাবুকগণ কামাল আতাতুর্কের রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শ সমর্থন করে বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে উদ্যোগী হন। এ প্রেরণা তারা পেয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলামের কাছ থেকে। নজরুল আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার এবং ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম ঐতিহ্যকে কবিতায় শিল্পরূপ দান করেছেন। এক কথায়, কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন মুসলিম জাগরণের অগ্রসেনানী। সেকালের মুসলমান সাহিত্যিকদের মধ্যে তার সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। বাঙালি মুসলমান যখন বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে আরবি-ফারসি ভাষা এবং আরব-ইরানের জীবন ও সংস্কৃতির মোহে আচ্ছন্ন হয়ে সেসব নিয়ে সাহিত্য রচনায় মগ্ন ছিলেন; নজরুল তখন বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি এবং বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্যকেই করেছিলেন জীবনের ধ্রুবতারা। মুসলমানদের ধর্মীয় রীতিনীতি, আচার এবং উৎসবাদী নিয়ে কবিতা রচনা করলেও তিনি ছিলেন সংস্কারমুক্ত, উদার এবং অসাম্প্রদায়িক চিন্তার অধিকারী। তাই গোঁড়া, ধর্মাচ্ছন্ন, সংস্কার-কুসংস্কারে জর্জরিত, আধমরা, ঘুমন্ত, আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা বাংলার মুসলমান সমাজকে ঘা মেরে জাগাতে ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ কাজী নজরুল ইসলামকেই ইমামের আসনে স্থান দিয়েছিল।
এভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- মুসলিম সাহিত্য-সমাজ, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন এবং কাজী নজরুল ইসলাম যেন এক ও অভিন্ন সত্তা। নজরুলের চিন্তাদর্শ বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎদের অফুরন্ত প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। শতবর্ষ আগে মুসলিম সাহিত্য-সমাজের সম্মেলনে সশরীরে যোগ দিয়ে নজরুল যে নতুনের গান শুনিয়েছিলেন এবং নবজীবনের আবাহন করেছিলেন, তা সেকালের গণ্ডি পেরিয়ে একালের মুসলমান সমাজকেও আন্দোলিত করে। তিনি নিজে যেমন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে প্রেরণা জুগিয়েছেন, তেমনি গোঁড়া মুসলমানদের কাছে ‘কাফের’ উপাধি পাওয়া একাকী নজরুল এ আন্দোলনের সারথিদের কাছ থেকেও লাভ করেছেন শক্তি-সাহস ও নব-উদ্দীপনা।