মানসিক মানবিক সুখে সমৃদ্ধ একটি সুন্দর জনপদ। যেখানে মিলেমিশে বসবাস করেন নানা ধর্ম বর্ণের মানুষ। এক বাউলের সঙ্গে সেখানকার সবার সখ্যতা। সেখানে বসবাস করেন এক বাউলও। প্রায় প্রতিরাতেই সবাই মিলে বসান গানের আসর। বাউলের পাশাপাশি ছিল এক সুন্দর যুগল।
গ্রামের শিশুদেরকে গান আর নৃত্য শেখাতো ইসমাইল-জবা। হঠাৎ একদিন তাদের ওপর নজর পড়ে একদল মানুষ রুপী রাক্ষুসে মানুষের। জবার আর তাদের গ্রামের মেয়েদের রক্তে লাল হয়ে উর্বর হয় সবুজ জমি। সর্বস্ব হারিয়ে জবা বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। জবার শোকে পাগল প্রায় তার প্রেমিক ইসমাইল বাউলের কাছে গিয়ে মনের শান্তনা খুঁজতে থাকে। রাক্ষুস রুপী মানুষদের বদ নজর থেকে বাউলও নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারেনি।
এক রাতে মুখোশ পরা হায়নারা এসে তার চুল কেটে লাঞ্চিত করে। ভেঙে গুড়িয়ে দেয় সব বাদ্যযন্ত্র। এই অপমান সহ্য করতে না পেরে বাউলও নিজেকে আত্মহুতি দেন। এই দৃশ্য দেখেছিলেন সেখানকার এক সাংবাদিক। তিনি তার কলমে এই ঘটনা ফুটিয়ে তুলতে সম্পাদকের টেবিলে গেলে সংবাদ প্রকাশ করতে অনীহা জানালে চাকরি ছেড়ে দেন সাংবাদিক। অন্য আরেকজন সম্পাদকের কাছে গেলে তিনি ছাপার ব্যবস্থা করলে নিখোঁজ হয়ে যায় ওই সাংবাদিক। এরপর শুরু হয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। তাদের দমাতে চালানো হয় গুলি। তবুও থামেনি আন্দোলন। এক পর্যায়ে অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে বিজয় অর্জিত হয় শিক্ষার্থীদের।
সেই আন্দোলনে মারা যায় প্রেমিক ইসমাইল। তার মরদেহ নিয়ে শোকে কাতর তার গ্রামবাসী। খোঁজ মিলে গুম হওয়া সেই সাংবাদিকদেরও। এভাবেই শেষ হয় দেশব্যাপী প্রযোজনা কেন্দ্রিক নাট্যকর্মশালার নাটক হাহাকার। মূলত নাটকে জুলাই বিপ্লবের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ৫২ ও ৭১ সালের ঘটনাও আনা হয় নাটকে।
জুলাই বিপ্লবের চেতনায় মুনীর চৌধুরী ১ম নাট্য উৎসবে রবিবার (২ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমির হাছনরাজা মিলনায়তনে সানি ঘোষ রবির রচনা ও নির্দেশনায় নাটকটি পরিবেশিত হয়।
নাটকটির সহাকারী নির্দেশনায় ছিলেন নাজমুল সরকার নিহাত, অথৈ দাস মেঘলা, নাফিসা নূর নোভা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রেজাউল করিম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সমর কুমার পাল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাপস রঞ্জন ঘোষ, সাংবাদিক বিজন কুমার সেন, খলিল রহমান, জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল, সাংস্কৃতি কর্মী তপন কুমার, মঞ্জু তালুকদার, সামিনা চৌধুরী মনী।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সমর কুমার পাল সকলের অভিনয়ের প্রশংসা করে বলেন, 'আমরা সবাই বলি সুনামগঞ্জ সংস্কৃতির শহর। শান্ত সুন্দর শহর আমাদের সুনামগঞ্জ। এখানের পথে ঘাটে অসংখ্য মেধাবীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেমন ছিলেন বাউল সম্রাট আব্দুল করিম, হাছন রাজা, রাধারমণ, পাগল হাসানসহ আরও অনেকে। আমরা বিশ্বাস করি আগামীতেও এই চর্চা অব্যাহত থাকবে।'
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, 'আমরা যা দেখেছি নাটকে তা আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস। ৫২ থেকে ২৪ ফুটে উঠেছে। কখন যে নাটক শুরু হলো আর শেষ হলো বোঝাই যায়নি। নাটকের কলাকৌশলীদের অভিনয় ছিল বাস্তবমুখী। কলাকৌশলী ও রচয়িতা সবাইকে ধন্যবাদ এমন নাটক উপহার দেওয়ার জন্য।'
নাটকে অভিনয় করেন সামির পল্লব, পল্লব ভট্টাচার্য, দৃষ্টি তালুকদার, বায়েজিদ, জিৎ দালুকদার, পার্থ সাহা, অলিদ হাসান তানবির, তৌহিদুর রহমান, দিব্যজিৎ চন্দ, সায়মন হাসান, আমান চৌধুরী, কাব্য, বর্ষা, পৌষি, পূজা, ঝর্না, প্রমি, শিপা, একুশ, রাজ, নিসান, রাইম, অহি, অমিত বর্মন, ঝুমা দাস, নাজমুল ইসলাম, মৌলি তালুকদার, সৃজন চন্দ, আমজাদ হোসেন, ফারদিন হাসান, মেহেদী, হাসান, দেওয়ান গিয়াস, মঞ্জু তালুকদার।
দেওয়ান গিয়াস/জোবাইদা/