চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতায় গোর্কি সদনে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) গানে, কবিতায় কবিকে স্মরণ করেন কলকাতার নজরুলপ্রেমীরা।
ছায়ানট কলকাতা’র সংগ্রহ থেকে নজরুল-বিষয়ক বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই কলকাতায় রুশ দূতাবাসের কনসাল জেনারেল ম্যাক্সিম কোজলভ নজরুলকে 'বিদ্রোহী' কবির পাশাপাশি 'প্রেমিক' কবি হিসেবে তুলে ধরেন। নজরুলের লেখা 'কবি-রানি' কবিতাটি তিনি বাংলা ও রুশ ভাষায় পাঠ করেন। তার কণ্ঠে এই কবিতা শুনে কলকাতার সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ আবেগবিহ্বল হয়ে পড়েন।
বাঙালির হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় নজরুল। দুই মনীষীকে স্মরণ করে বিশিষ্ট রুশ ইতিহাসবিদ নাতালিয়া গেরাসিমোভার লেখা কবিতা বাংলা ও রুশ ভাষায় পাঠ করেন ম্যাক্সিম কোজলভ। কলকাতায় রুশ দূতাবাসের ভাইস কনসাল একাতেরিনা তুরিনা বাংলায় এবং রুশ ভাষায় পাঠ করেন নজরুলের লেখা স্বল্পশ্রুত কবিতা 'ভীরু'। গোর্কি সদনের রুশ ভাষা শিক্ষা বিভাগের ছাত্রীদের পরিবেশনা অনুষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করে। তাদের কণ্ঠে শোনা যায় ২টি জনপ্রিয় নজরুল-সঙ্গীত 'আমি যার নূপুরের ছন্দ' এবং 'দুর্গম গিরি কান্তার মরু'।
সোমঋতা মল্লিকের পরিচালনায় ছায়ানট কলকাতা’র শিল্পীবৃন্দ সমবেতভাবে নজরুলের দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন। 'মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম', 'নবীন আশা জাগলো যে রে আজ', 'চল্ চল্ চল্', 'কারার ওই লৌহ কপাট' -গানগুলির সঙ্গে দর্শকরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে গলা মেলান।
এরপর ইন্দ্রাণী চৌধুরী নজরুলের লেখা 'বিজয়িনী' কবিতাটি পাঠ করেন। পরবর্তীতে পরিবেশিত হয় 'নজরুলের প্রাণপ্রিয় বুলবুল'। কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে তার অকালপ্রয়াত দ্বিতীয় পুত্রের প্রভাবের কথা তুলে ধরা হয়। কবিতায় অংশগ্রহণ করেন রাজশ্রী বসু, তিস্তা দে এবং দেবলীনা চোধুরী। সোমঋতার কণ্ঠে শোনা যায় 'শূন্য এ বুকে পাখি মোর' গানটি, নজরুলপ্রেমীদের চোখ আর্দ্র হয়ে ওঠে। নজরুল রচিত ২টি শ্যামা-সঙ্গীত অনুষ্ঠানে অন্য মাত্রা যোগ করে।
অনুষ্ঠান শেষ হয় সোমঋতার কণ্ঠে 'আমি চিরতরে দূরে চলে যাব' গানটি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন গোর্কি সদনের পক্ষে শ্রী গৌতম ঘোষ। তার সাবলীল সঞ্চালনা এবং নজরুলকে নিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা অনুষ্ঠানে বিশেষ মাত্রা যোগ করে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, গত ১২ ডিসেম্বর কলকাতায় গোর্কি সদনে বিশেষ অনুষ্ঠানে রাশিয়ান ফেডারেশনের কনসাল জেনারেল ম্যাক্সিম কোজলভ - এর হাতে ছায়ানট কলকাতা’র পক্ষ থেকে একটি বিশেষ ছবি তুলে দেওয়া হয়। ছবিটির বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে-রাশিয়ান ভাষায় অনূদিত নজরুল রচনা-প্রকাশ অনুষ্ঠানে সোভিয়েত প্রতিনিধিদের মাঝখানে নজরুল (১৯৬৭)। কাজী নজরুল ইসলামের সুহৃদ মুজফ্ফর আহ্মদ- এর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, "শুনেছি (চোখে দেখিনি) 'সাম্যবাদী' তখন রুশ ভাষায় তর্জমা করা হয়েছিল।" 'বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্য' প্রবন্ধে নজরুল বিশ্বের মহান সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির কথা উঠে এসেছে।
গোর্কি সম্পর্কে নজরুল বলেছেন -"তারপর এল এই মহাপ্লাবনের ওপর তুফানের মতো - ভয়াবহ সাইক্লোনের মতো বেগে ম্যাক্সিম গোর্কি। চেকভের নাট্যমঞ্চ ভেঙে পড়ল, সে বিস্ময়ে বেরিয়ে এসে এই ঝড়ের বন্ধুকে অভিবাদন করলে। বেদনার ঋষি দস্তয়েভস্কি বললে : তোমার সৃষ্টির জন্যই আমার এ তপস্যা। চালাও পরশু, হানো ত্রিশূল! বৃদ্ধ ঋষি টলস্টয় কেঁপে উঠলেন। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে বলে উঠলেন : That man has only one God and that is Satan. কিন্তু এই তথাকথিত শয়তান অমর হয়ে গেল, ঋষির অভিশাপ তাকে স্পর্শও করতে পারলে না।
গোর্কি বললেন: দুঃখ-বেদনার জয়গান গেয়েই আমরা নিরস্ত হব না — আমরা এর প্রতিশোধ নেব। রক্তে নাইয়ে অশুচি পৃথিবীকে শুচি করব।"
নজরুল গবেষক মাহবুবুল হকের নজরুল তারিখ অভিধান থেকে জানা যায়- ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই খ্যাতনামা রুশ লেখক মক্সিম গোর্কির মৃত্যুতে (১৮ জুন, ১৯৩৬) প্রগতি লেখক সংঘের উদ্যোগে কলকাতার অ্যালবার্ট হলের কমিটি রুমে যে শোক সভা হয় তার অন্যতম আহ্বায়ক ছিলেন নজরুল। নজরুল ছাড়াও এ সভায় উপস্থিত ছিলেন সতেন্দ্রনাথ মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, বিবেকান্দ মুখোপাধ্যায়, খগেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখ। এই সভা থেকেই নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তকে সভাপতি ও সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামীকে সম্পাদক করে নিখিল বঙ্গ প্রগতি লেখক সংঘ গঠনের কথা ঘোষিত হয়।
এইসব তথ্যের ভিত্তিতে সহজেই বলা যায় - রুশ বিপ্লব, রুশ সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত ছিলেন চেতনার কবি নজরুল। তাই নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে গোর্কি সদনে তার স্মরণে ছায়ানট (কলকাতা) এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত ১৮ বছর ধরে কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টির বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছে ছায়ানট (কলকাতা)। শুধুমাত্র কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী কিংবা প্রয়াণ দিবস স্মরণ করা নয়, সারা বছর ধরেই তার সৃষ্টি নিয়ে চর্চা করাই ছায়ানটের উদ্দেশ্য। নজরুল স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নজরুলপ্রেমীদের অবগত করাও ছায়ানটের কার্যক্রমের অংশ।
ছায়ানট কলকাতা’র সভাপতি সোমঋতা মল্লিক বলেন, "আমরা জানতে পারি, নজরুলের বেশ কিছু সাহিত্যকর্ম রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এই বিশেষ ছবির সন্ধান পাই যা সত্যি আমাদের চমৎকৃত করে। সেই ছবিটি গোর্কি সদনে রাশিয়ান ফেডারেশনের কনসাল জেনারেল ম্যাক্সিম কোজলভ - এর হাতে তুলে দিতে পেরে আমরা সত্যিই আনন্দিত। বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি গোর্কি সদনের প্রোগ্রাম অফিসার শ্রী গৌতম ঘোষের প্রতি, তার আন্তরিক সহযোগিতায় আমাদের স্বপ্নপূরণ হয়েছে।
আশা করি গোর্কি সদনের সংগ্রহশালায় যত্ন সহকারে প্রদর্শিত হবে এই ছবি, সংস্কৃতিমনস্ক মানুষেরা এলে সহজেই দেখতে পাবেন। আজ এই বিশেষ অনুষ্ঠানে আমাদের প্রাণের কবিকে স্মরণ করতে পেরে আমরা সত্যিই অভিভূত।"
এসএন/