জুলাই আন্দোলন ছাত্রদের পাশাপাশি অংশ নিয়েছিল দেশের সর্বস্তরের মানুষ। বিপ্লবে রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের ভূমিকাও কম নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রথম ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস ঘোষণা করা হয়। কারফিউ ভেঙে সর্বপ্রথম ‘শেইম শেইম, ডিক্টেটর’ স্লোগান দেয় রাবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। রাজশাহীতে আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার অভ্যূত্থান পরবর্তী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক গোলাম কিবরিয়া মোহাম্মদ মেশকাত চৌধুরীর সাথে কথা বলেছেন খবরের কাগজের রাবি প্রতিনিধি এস আই সুমন
আপনি সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিকতা থেকে আন্দোলনে এলেন কীভাবে?
মেশকাত চৌধুরী: আমি প্রায় ৫ বছর ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতা করেছি। করোনাপরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনকে কেন্দ্র করে যে সিট বাণিজ্য চলত, সেটা নিয়ে গণমাধ্যমে আমার একটা রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। পরে কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই আমাকে গণমাধ্যম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর সাংবাদিক হিসেবে সে পরিচয়টা আর ছিল না। ফলে আমার হাতে তখন অনেক সময় ছিল। তখন ক্যাম্পাসে আমার বিভিন্ন সোর্স যেমন- শিক্ষক, সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর সঙ্গে মাফিয়াতন্ত্রের দুঃশাসন থেকে মুক্তির রাস্তা নিয়ে আমরা কথা বলতাম। ’২৪-এর আন্দোলনের প্রথম দিকে আমি একটু বাইরে ছিলাম। এখানে এসে দেখলাম ছোটদের বেশকিছু জায়গায় কৌশলগত ত্রুটি ছিল। শেখ হাসিনা যখন গণহারে সবাইকে রাজাকারের নাতিপুতি বলা শুরু করল, তখন আমি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করলাম। গত ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা চালায়। এরপর ১৫ জুলাই রাতে আমরা পরিকল্পনা করি, মাত্র ৩০ থেকে ৪০ জন ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীর হাত থেকে ছাত্র-জনতার আন্দোলন করার অধিকার কীভাবে ছিনিয়ে আনতে পারি। এরপর একটা পর্যায়ে আমি চোখের সামনেই দেখলাম, মাদার বখশ হলের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ হিল গালিব পালিয়ে যাচ্ছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম হাসিনার দোসর সম্পূর্ণ ইউনিট ধরে বিতাড়িত হয়েছে।
আপনাদের সমন্বয়ক কমিটি ক্যাম্পাস বন্ধ হওয়ার পরে দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে আপনারা কীভাবে আন্দোলন পরিচালনা করেছেন?
ক্যাম্পাস বন্ধ হওয়ার পর বিভিন্ন গুজবের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছিল। ফলে শিক্ষার্থীরা অনেকেই বাধ্য হয়ে রাজশাহী ছেড়ে যাচ্ছিল। তখন আমরা পরিকল্পনা করলাম যেকোনো মূল্যে রাজশাহীতে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় জনগণ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সমন্বয় করে আন্দোলন পরিচালনা করার। একপর্যায়ে আমরা শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন পরিচালনা শুরু করলাম। কারণ আমাদের বিশ্বাস ছিল, পুলিশ অন্তত শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলবে না। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকে গণপরিসরে ছড়িয়ে দিতে আমরা বিভিন্নভাবে জনগণকে আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছি। তাদেরকে জানানো হয়েছে এটা শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নয়, এ আন্দোলন সবার।
ক্যাম্পাস বন্ধ হওয়ার পরই তো ইন্টারনেটও বন্ধ হয়ে যায়। তখন ইন্টারনেট ছাড়া কীভাবে কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করেছেন?
যতদিন ইন্টারনেট বন্ধ ছিল ততদিন আমাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল সেলফোন। তখন সবার সঙ্গে যোগাযোগ করছিলাম কিভাবে কী করা যায়, কাকে কাকে নিয়ে কমিটি করা যায়। অনেককেই জিজ্ঞেস করছিলাম থাকবেন কি না? বেশির ভাগ লোকই প্রত্যাখ্যান করেছিল তখন। পরে আমরা সাহস করে দায়িত্বটা কাঁধে নিয়ে নিই। এরপর ইন্টারনেট সচল হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টাই আমরা ভিপিএন কানেক্টেড থাকতাম। এর মধ্যে আমরা দেখলাম, মূলধারার মিডিয়াগুলো আর আমাদের সাহায্য করছে না। তারা অনেকেই আন্দোলনকে জামায়াত-শিবিরের আন্দোলন হিসেবে প্রচার করতে থাকে। ফলে আমরা সিদ্ধান্ত নেই সোস্যাল মিডিয়াকেই প্রধানতম মিডিয়ায় রূপান্তর করে ফেলার। তখন আমরা প্রীতিলতা ব্রিগেড করি, আমাদের একটা টেকনিক্যাল টিম ছিল। ফেসবুকে আমাদের যে বড় গ্রুপটা ছিল, সেটাতে কিছু গোপন সমস্যার কারণে আমরা আরেকটা গ্রুপ খুলি- যেটা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। এই গ্রুপের মাধ্যমে আমরা স্থানীয়দেরকেও কানেক্ট করতাম এবং তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করতে পারে সে ধরনের প্রোগ্রামগুলো রাখার চেষ্টা করতাম। আন্দোলনকারী বোনদের জন্যে প্রীতিলতা ব্রিগেড তৈরি করলাম। যেন এই স্বৈরাচারী হাসিনার কর্মকাণ্ড মানুষের চিন্তা থেকে সরাতে না পারে- এ লক্ষ্য নিয়ে পুরো আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনা তাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি এবং জনমত গঠনের চেষ্টা করি। আমাদের শুধু কর্মসূচিটাই কেন্দ্র থেকে দেওয়া হতো। তা ছাড়া কখন কিভাবে কী হবে, সেটা আমরা স্থানীয়ভাবেই পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতাম।
আপনারা কখনো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, আবার কখনো রুয়েটে; আবার কখনো তালাইমারীতে আন্দোলন করেছেন। আন্দোলনের সময় এই স্থান পরিবর্তনের কারণ কী?
আমরা একটা জিনিস দেখতে পাচ্ছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পর একটু কঠিন হয়ে যায়। এ ছাড়াও শিক্ষানগরী রাজশাহীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে নিয়ে আসা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ তখন পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুন্ডারা রাস্তায় বিভিন্নভাবে তাদের নিপীড়ন করছিল।
এ ছাড়াও কোনোভাবে সংঘর্ষ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে পালানোর জায়গাও কম। ফলে আমরা আন্দোলন রুয়েট গেটে নিয়ে গেলাম, যেখানে অন্তত ৫ থেকে ৭টা পথ দিয়ে আসা যায়। তখন ওই চিন্তা করে রুয়েটে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জমায়েত বড় হতে থাকলে আমরা আস্তে আস্তে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে গণমিছিলগুলো নিয়ে যেতাম। এই জিনিসটা জনগণকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এভাবেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকে আমরা রাজশাহীর গণমানুষের মাঝে আন্দোলনে ছড়িয়ে দিলাম।
রাজশাহীতে কারফিউ ভাঙলেন কীভাবে?
১৬ ও ১৭ জুলাইয়ের আন্দোলন দমিয়ে দিতে হাসিনা কারফিউ জারি করল। কারফিউ-পরবর্তীতে সারাদেশে আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়ে। এরপর দেশে সর্বপ্রথম কারফিউ ভেঙে দেওয়ার দুঃসাহস দেখান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহসী শিক্ষার্থীরা ও রাজশাহী অঞ্চলের জনগণ। সেদিন ছিল ২৯ জুলাই। আমি সমন্বয়ক হওয়ার পরে প্রথম দিন। জোহা স্যারের মতোই বর্তমান উপাচার্য নকীব স্যার, আরবি বিভাগের মাসুদ স্যার, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সেলিম রেজা নিউটন, আ. আল মামুন স্যারসহ কয়েকজন সাহসী শিক্ষক আমাদের সঙ্গে ছিলেন। এটাই ছিল হাসিনার কারফিউ ভেঙে দেওয়ার প্রথম প্রচেষ্টা। সেদিন আমরা একটা কৌশল অবলম্বন করেছিলাম। আমরা প্রথমে ঘোষণা দিয়েছিলাম মেইন গেট থেকে কাজলা গেটে যাওয়ার। কিন্তু আমরা উল্টো দিকে প্রধান ফটক থেকে বিনোদপুর গেটের দিকে যাত্রা শুরু করি। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজলা রোডে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিয়েছিল। সেই কারফিউ ভেঙে সারা দেশে আমরা সর্বপ্রথম ‘শেইম শেইম, ডিক্টেটর’ স্লোগান দেই।
আন্দোলনের সময় সরকারি বাহিনী ও আওয়ামী লীগের হামলার চ্যালেঞ্জগুলো আপনারা কীভাবে মোকাবিলা করেছেন?
এ আন্দোলনের সময়গুলোতে কোন দিন কী হবে, এটা ধারণা করা যাচ্ছিল না। এমনকি ৫ আগস্ট হাসিনা পালিয়ে যাবে- আমরা এটাও জানি না। যেখানে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে, সেখানে কোনো ধারণা করা যায় না। সে সময় একটাই চিন্তা থাকে যে এই মাফিয়াতন্ত্র থেকে মুক্তি। মানুষের মুক্তি হলেই আমাদের মুক্তি হয়। তখন বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এর আগেও যারা আন্দোলনে ছিল, তাদের ডিজিএফআই ও ডিবি তুলে নিয়ে যাচ্ছিল। এমনকি একজন সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী বড় ভাইকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমরা এই চ্যালেঞ্জগুলোকে ত্রাস হিসেবে না নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছি। তারপরও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গায়ে পড়ে আমাদের ভাইদেরকে শহীদ করেছে। আমরা একটাই চিন্তা করছিলাম, আমাদের পালানোর কোনো পথ নেই। ‘বিপ্লব অথবা মৃত্যু’- এমন যাত্রাই করেছিলাম। মন থেকে দীক্ষিত হয়ে নেমেছিলাম আমরা। ফলে আমাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেই হতো।
যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আপনারা আন্দোলন করেছিলেন, বর্তমান বাংলাদেশ সেদিকে যাচ্ছে বলে আপনার মনে হয় কী?
এ আন্দোলনে পঞ্চম শ্রেণি থেকে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাদ্রাসাসহ সব প্রতিষ্ঠানের সব বয়সের মানুষ ছিল। রিকশাচালক, কুলি, গার্মেন্টস শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ ছিল। এখানে ধর্ম, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে সবাই যোগ দিয়েছিলেন। এমনকি আওয়ামী লীগেরও যারা এ গণহত্যা মেনে নিতে পারেননি, তারাও যোগ দিয়েছিলেন। যারা ভুলকে ভুল বলতে পারেন, সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে পারেন- তারা সবাই এসেছিলেন। তাদের প্রতিশ্রুতি, ৫৩ বছরের প্রতারণা থেকে বের হয়ে একটা সুন্দর বাংলাদেশ। তারা বিচারহীনতার সমাজের পরিবর্তন চেয়েছিলেন। তাদের একটা নতুন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। তবে একটা ফ্যাসিবাদের পলায়নের পরও তার কাঠামো থেকে যায়। ফ্যাসিবাদের হালুয়া-রুটি খাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরিয়ে দিয়ে একটা জনতার প্রশাসন গড়তে পারলেই একটা সুন্দর বাংলাদেশ হবে। আমি এ দেশের রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি বদলে দিয়ে একটা দারুণ রাজনৈতিক পরিচ্ছন্নতার দিকে যেতে চাই। এটার জন্য আমাদের কার্যক্রম চলছে এবং আমরা এটার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। যতদিন এটা না হচ্ছে, ততদিন আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।
আন্দোলনের পর দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু পরিবেশ বিরাজ করছে বলে আপনার মনে হয় কি? শিক্ষাঙ্গনে কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন?
একটা বিষয় খেয়াল করবেন, শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা যদি বলি আমরা দেখিয়েছি- ছাত্রলীগ কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন খাত থেকে প্রায় ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সিটবাণিজ্যের মাধ্যমে। শিক্ষার্থীরা তার পরিবর্তে আবেদন করে নিয়মানুযায়ী সিট পাচ্ছে। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য শিক্ষার একটা অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগের পরিস্থিতি থেকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সার্বিকভাবে দেশটা উন্নত হচ্ছে, তবে কিছু জায়গায় স্বজনপ্রীতি রয়েছে।
ধন্যবাদ আপনাকে।
আপনাকেও ধন্যবাদ।
হাসান