অধ্যবসায়, একাগ্রতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি দায়বদ্ধতা- এই গুণগুলো যেকোনো মানুষকে অসাধারণ করে তোলে। ঠিক এমনটাই ঘটেছে হালিমাতুস সাদিয়ার ক্ষেত্রে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই মেধাবী শিক্ষার্থী সম্প্রতি ১৭তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন। এটি শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসেও এক অনন্য মাইলফলক। এই কৃতীসন্তান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার লোহালিয়া গ্রামের মেয়ে হালিমাতুস সাদিয়াকে নিয়ে লিখেছেন জাকির হোসেন।
স্বপ্ন শুরুর গল্প
হালিমাতুস সাদিয়ার আইনপথে যাত্রা শুরু হয়েছিল এক গভীর প্রত্যয় নিয়ে। ছোটবেলা থেকে তিনি গতানুগতিক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার পেশার বাহিরে গিয়ে ভিন্নধর্মী কোনো পেশায় নিজেকে ভাবতেন। বাবার থেকে আইন পেশা সম্পর্কে জানতে পারেন শৈশবকালে। বিচারকের পোশাক ও কাঠের হাতুড়ির প্রতি তার তখন তৈরি হয়েছিল আলাদা এক আকর্ষণ। সেই থেকেই স্বপ্ন বোনা শুরু। স্বপ্ন ছোঁয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ভর্তি হন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে।
শিক্ষাজীবনে ছিলেন অনন্য
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। একাডেমিক ফলাফলে বরাবরই ছিলেন সেরার সারিতে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় শ্রেণিতেই বিভাগের প্রথমস্থান অর্জনের মাধ্যমে শেষ করেন একাডেমিক পড়াশোনা। পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমেও ছিল সাফল্য। অর্জন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা বিতার্কিকের খেতাব। অংশগ্রহণ করেছিলেন আইন বিভাগ সম্পর্কিত মোটিং-এ। সেখানে ‘বেস্ট মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ প্রাপ্ত হন এই গুণী শিক্ষার্থী। শিক্ষাজীবন নিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম থেকেই ভালো পড়াশোনা করার চেষ্টা করতাম। প্রতিটি ক্লাস খুব মনোযোগ সহকারে করেছি এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়গুলোও নোট করতাম। যার ফলে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় শ্রেণিতে আল্লাহর রহমতে প্রথমস্থান অর্জন করতে পেরেছি।’
সহকারী জজ নিয়োগে হলেন দেশসেরা
সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নিজের অসামান্য মেধা ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। কঠোর প্রতিযোগিতামূলক এই পরীক্ষায় সারা দেশের হাজারও প্রার্থীকে পেছনে ফেলে তিনি হয়েছেন প্রথম। তার এই সাফল্যের পেছনে ছিল নিরবচ্ছিন্ন অধ্যয়ন, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একাডেমিক জীবনে বিজেএস পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কোর্সগুলো খুব ভালোভাবে পড়েছিলাম এবং স্নাতকে থাকার সময়েই টুকটাক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলাম। দীর্ঘ একটা পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও সবার দোয়ার ফলে এই সফলতা ছুঁতে পেরেছি।’
সাফল্যের পেছনে অনুপ্রেরণা
সাদিয়ার এই অসাধারণ অর্জনে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল পরিবার। সেই সঙ্গে শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধবসহ অনেকেই উৎসাহ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘মূলত স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন বাবা। তিনি স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। সেই পথের সহযাত্রী ছিলেন আমার মা এবং সাহস জুগিয়েছিলেন ভাইয়া। বিশেষ করে আমার মায়ের কথা বলতেই হয়। পড়াশোনার সময় তিনি আমার পাশে বসে থাকতেন। বিশেষ করে রাত বেশি হলে যেন ভয় না পাই সেজন্য সাহস দিতেন।’
ফলাফল জানার পরের অনুভূতি
নিজে দেশসেরা সহকারী জজ হওয়ার আনন্দের চেয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ দেশসেরা হয়েছেন এই বিষয়টি সাদিয়াকে অধিক আনন্দিত করেছিল বলে জানান তিনি। এর পাশাপাশি মা-বাবাকে জজের মা-বাবা করতে পেরেছেন এই বিষয়টিই তাকে নিজের সফলতার চেয়ে বেশি আনন্দিত করেছে।
সফলতা পাওয়ার মূলমন্ত্র
প্রবল আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় এবং সৃষ্টিকর্তায় ভরসার মাধ্যমে একাডেমিক জীবনে ও প্রতিযোগিতামূলক এ পরীক্ষায় সফলতার মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে বলে জানান দেশসেরা সহকারী জজ হালিমাতুস সাদিয়া। তিনি বলেন, ‘আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, নিয়মিত পড়াশোনা করা এবং লেগে থাকতে হবে, হাল ছাড়া যাবে না। আমি একাডেমিক জীবনের শুরু থেকেই এ পর্যন্ত নিয়মিত পড়াশোনা করেছি এবং সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখেছিলাম।’ এই পথের অনুজ পথিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘নিয়মিত পড়াশোনা করতে হবে, অধ্যবসায় চালিয়ে যেতে হবে এবং সৃষ্টিকর্তায় ভরসা রেখে লেগে থাকতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ৩২ বছরের আগে মারা যাওয়া যাবে না। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।’
ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও দায়িত্ববোধ
সাফল্যের পর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে হালিমাতুস সাদিয়া বলেন, ‘এই অর্জন শুধু আমার একার নয়, আমার পরিবার, শিক্ষকদের, বন্ধুদের ও সংশ্লিষ্ট সবার। আমার স্বপ্ন- আমি সব সময় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করব। কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন শাস্তি না পায় এই বিষয়টি নিশ্চিত করাই আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। আমি আমার কর্মতৎপরতা ও চেষ্টা দিয়ে বিচারব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে যাব।’
/রিয়াজ