চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে মারধরের ঘটনার জের ধরে শিক্ষার্থী ও পাশের জোবরা গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিক-গ্রামবাসীসহ কয়েক শ আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪০০ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
গত শনিবার মধ্যরাতে শুরু হওয়া সংঘর্ষ রবিবার (৩১ আগস্ট) বিকেল পর্যন্ত চলে। পরে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
এর আগে বেলা ২টায় পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৪৪ ধারা জারি করে হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন। আজ সোমবার রাত ১২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি থাকবে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আন্তরিকতার অভাব ছিল।
ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন রবিবার দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘জোবরা গ্রামের লোকজন আমাদের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে। দুই দিনে আমাদের ৪০০ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আমাদের প্রক্টরসহ বেশ কিছু শিক্ষক আহত হয়েছেন। আহত শিক্ষার্থীদের আমরা মেডিকেলে জায়গা দিতে পারিনি। তিনটি গাড়িতে করে আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছি। ছাত্রলীগের ক্যাডাররা হেলমেট পরে আমাদের ছাত্রদের ওপর হামলা চালিয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে কথা বলেছি। ২ ঘণ্টা পার হওয়ার পরও আমাদের বাঁচাতে কেউ আসেনি।’
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার অনুরোধ, তোমরা কোনো ষড়যন্ত্রে পা দিও না। আমি তোমাদের অনুরোধ করছি। তোমাদের নিরাপত্তার স্বার্থে যা করার সব আমরা করব।’
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের এক ছাত্রীকে গত শনিবার রাত সোয়া ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন একটি ভবনের দারোয়ান মারধর করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেটসংলগ্ন ভবনটিতে ভাড়া থাকেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি বাসায় ঢুকতে গেলে দারোয়ান দরজা খুলছিলেন না। অনেক ডাকাডাকির একপর্যায়ে দারোয়ান তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। ওই ছাত্রীকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে চড়-লাথি মারেন। এ সময় ওই ছাত্রী তার বন্ধুদের ডাকলে সেখানে যাওয়ার পর তাদের ওপরও হামলা হয়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা অভিযুক্ত দারোয়ানকে প্রক্টরের কাছে সোপর্দ করতে চাইলে এলাকাবাসী তাদের ওপর হামলা করে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। শনিবার রাতের ঘটনার বিষয়ে দর্শন বিভাগের প্রথম বর্ষের ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি প্রতিদিন সময়মতো বাসায় ফিরি। আজও দেরি করিনি। দারোয়ান দরজা খুলছিল না, পরে হঠাৎ আমার গলায় চড় মারেন এবং ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। এরপর লাথিও মারতে থাকেন।’
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শনিবার রাতে সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়িতে যেসব শিক্ষার্থীরা ভাড়া থাকেন, তাদের অবরুদ্ধ করে রাখেন স্থানীয়রা। সেই খবর পেয়েই তারা একত্রিত হয়ে উত্তরা আবাসিক এলাকায় যান। এ সময় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ ছাড়া ইটপাটকেলও নিক্ষেপ করা হয় শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে। অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষার্থীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে। এতে তাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যার ফলে তারা প্রতিরোধ করতেই শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিয়েছেন।
কী ঘটেছিল শনিবার রাতে
এলাকাবাসী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে দারোয়ানকে ছিনিয়ে নেওয়ার পর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। তারা অভিযুক্ত দারোয়ানকে খোঁজার উদ্দেশ্যে সামনে যেতে থাকলে রাত ১টা ৪০ মিনিটে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে জোবরা গ্রামের শতাধিক মানুষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালান। এরপর দফায় দফায় সংঘর্ষ চলতে থাকে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশের মোট চারটি গাড়ি ভাঙচুর করেন স্থানীয়রা। ঘটনার একপর্যায়ে রাত ৩টার পর সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌছেঁ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষার্থী যারা বিভিন্ন ভবনে আটকা পড়েছিলেন, তাদের উদ্ধার করা হয়। কিন্তু ওই সময় পুলিশের কোনো উপস্থিতি দেখা যায়নি।
গতকাল সকাল থেকে ফের সংঘর্ষ
শনিবার রাতের ঘটনার জেরে গতকাল রবিবার সকাল ৯টা থেকে জোবরা গ্রামে দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিষয়টি সমঝোতা করতে সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনাস্থলে গেলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রশাসনের লোকজন সেখান থেকে ফিরে আসার সময় স্থানীয়রা তাদের ওপরও হামলা চালান। শিক্ষার্থীরা বলছেন, রবিবার সকালে সেনাবাহিনী দেখতে পেয়েছেন তারা। তবে ১ ঘণ্টাব্যাপী অভিযান চালিয়ে তারা চলে যান। এরপর দুপুর ১২টার দিকে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তারা সফল হননি।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, সংঘর্ষের সময় শুধু স্থানীয় বাসিন্দারা নয়, ছাত্রলীগের একটি অংশও তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। ইটপাটকেলের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্রও ব্যবহার করা হয়। এতে অনেক শিক্ষার্থী রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী সাঈদ বলেন, ‘আমাদের বন্ধুদের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়েছে।’
আহত কয়েক শ
শনিবার রাত ও গতকাল রবিবার দিনভর সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন কয়েক শ শিক্ষার্থী। শনিবার রাতে আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ৩০ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরা হলেন সজীব (২৪), মোহাম্মদ ইসমাইল (২৫), হুমায়ুন (২২), সাদমান (২৪), ইশতিয়াক (২৪), মো. আবু নাসিম (২৩), হাসান জোবায়ের হিমেল (২৫), ইদ্রিস (২৫), মনির (২২), মাহিন (২৩), সজীব, ইশতিয়াক আহমদ (২৪), রাতুল (২১), শিহাব (২২), আলমাস মাহফুজ (২৫), বাইজিদ (২০), দিগন্ত (২৫), ওয়াহিদউদ্দিন, নাজমুল (২৫), বায়জিদ (২০), ফুয়াদ (২১) , রাকিব মাহবুব রুমি (২৪), রিপন মিয়া (২১), মাহিন (২২), সিফাত আদনান (২২), আকিব (২২), আরমান (২৫), দুর্জয় (২২) ও মোকাব্বির (২৪)।
অন্যদিকে গতকাল দিনভর সংঘর্ষে আরও কয়েক শ শিক্ষার্থী আহত হন। আহত শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল, হাটহাজারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলার বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল কলেজে অর্ধশতাধিক ভর্তি আছেন। কয়েক শ শিক্ষার্থীকে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন বলে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
স্থানীয় এক সাংবাদিক খবরের কাগজকে বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ৩০ গ্রামবাসী আহত হয়েছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বাড়িঘর, দোকান ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। এদিকে যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ায় জোবরা গ্রামের পুরুষরা এলাকা ছেড়ে পালিয় যান।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মেডিকেলে ৭৭ জন, পার্কভিউ হাসপাতালে ৪৩, ন্যাশনাল হাসপাতালে ২৪ জন চিকিৎসাধীন। গুরুতর আহত চবি ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী নাইম রহমানকে ন্যাশনাল হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। সংঘর্ষে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের নেতা মাসনূনকে কোপানো হয়েছে বলেও দাবি করেছেন সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখ্য সংগঠক সাব্বির হোসেন। ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন নিজেও আটকা পড়ে ছিলেন জানিয়ে খবরের কাগজকে বলেন, শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করছিলাম। কয়েকজনকে এলাকাবাসী থেকে উদ্ধার করেছি। প্রশাসন চাইলে শুরুতেই ঘটনার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারত। প্রশাসনের অনুপস্থিতি এ ঘটনাকে এমন রূপ দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর নুরুল হামিদ জানান, সহকারী প্রক্টর নাজমুল ও কোরবানও আহত হয়েছেন।
জব্দ করা অস্ত্র শিক্ষার্থীদের হাতে
এদিকে গত বছরের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে জব্দ করা দা, কিরিচ, হেলমেটসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা দপ্তর থেকে রবিবার দুপুরে ছিনিয়ে নেন। এসব অস্ত্র নিয়ে তারা ফের গ্রামবাসীর সঙ্গে মারামারি করতে ছুটে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার রাতে শিক্ষার্থীদের হাতে কোনো ধরনের অস্ত্র ছিল না। নিরাপত্তা দপ্তর থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার পর সংঘর্ষ আরও বেশি রক্তক্ষয়ী হওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। তবে গতকাল বিকেলে ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনী প্রবেশ করলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।