রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনের আচরণবিধিতে বলা হয়েছে, ‘প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার দিন থেকে ভোট গ্রহণের ২৪ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচার চালানো যাবে। প্রচারের সময় সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। প্রার্থী ও ভোটার ছাড়া অন্য কেউ কোনোভাবেই কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রচার চালাতে পারবেন না। নির্বাচনি প্রচারে শুধু সাদা-কালো পোস্টার ব্যবহার করা যাবে। ভবনের দেয়ালে লেখনী ও পোস্টার লাগানো যাবে না।’
ছাত্রনেতা ও প্রার্থীরা বলছেন, রাকসু নির্বাচনে একটি আচরণবিধি দেওয়া হয়েছে, তবে এটি পূর্ণাঙ্গ নয়। এখানে আরও অনেক কিছুই যোগ করতে হবে। তারা এটাকে একটি দুর্বল আচরণবিধি বলে মনে করছেন। আর এই সুযোগটাই নিচ্ছে ইসলামী ছাত্রশিবির। তারা প্রশাসনের নাকের ডগায় আচরণবিধির বাইরে গিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। এমনকি শিক্ষার্থীদের নানা উপঢৌকন পর্যন্ত উপহার দিচ্ছে। যেগুলো সাধারণ বিবেচনায় আচরণবিধিতে নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল। নির্বাচন কমিশন ছাত্রশিবিরের এমন আচরণে নির্বিকার। তাই কমিশন কতটা স্বচ্ছভাবে রাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন প্রার্থী ও শিক্ষার্থীরা।
রাকসু, হল সংসদ এবং সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের আর ১০ দিন বাকি। তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিল, প্রত্যাহারের সময় শেষ হয়েছে। গতকাল চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের কথা থাকলেও সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু মনোনয়পত্র তোলার পর থেকেই বিভিন্ন হলে ছাত্রশিবিরের মনোনীত প্যানেল প্রার্থীরা আতর, পাম্পার, প্লেটসহ বিভিন্ন ‘উপঢৌকন’ বিতরণ করছেন বিভিন্ন হলে। তারা সেসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার করছেন। অন্য প্রার্থীরা বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করলেও নির্বিকার রাকসুর নির্বাচন কমিশন।
সর্বশেষ হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী হলে শিবিরের পক্ষ থেকে পানির ট্যাঙ্ক ও ফিল্টার দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে হল প্রাধ্যক্ষের নির্দেশে সেগুলো নামিয়ে ফেলা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, আচরণবিধিতে খরচসংক্রান্ত বিষয়সহ আরও সংস্কার করা প্রয়োজন। হল প্রাধ্যক্ষদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যারা এই কাজগুলো করছে তাদের খোঁজ নিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি সাপেক্ষে আচরণবিধিতে আরও কিছু বিষয় সংযুক্ত করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি হলের প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। তারা বলেছেন, ‘আমাদের কাছে সুস্পষ্ট কোনো অভিযোগ আসেনি।’ হলে কে কী দিয়েছেন সে বিষয়ে তারা খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়-২৪ হলে শিবিরের প্যানেল থেকে নেতৃত্বে থাকছেন রাসেল ও মেশকাত। তারা কয়েক দিন আগে হলের ডাইনিংয়ে কিছু প্লেট ক্রয় করে উপহার দেন। এর একটি ছবিও প্যানেলের ভিপি প্রার্থী রাসেল মিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার হল সংসদে শিবির প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী তাজুল এবং জিএস পদে আরিফ নির্বাচন করবেন। গত শনিবার প্যানেলের পক্ষ থেকে হলে বাইসাইকেলের পাম্পার উপহার দেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমীর আলী হল সংসদে ভিপি পদপ্রার্থী নাঈম ইসলাম ও জিএস পদপ্রার্থী সাব্বির হোসাইন হলের রিডিং রুমে গত ৩০ আগস্ট ডিজিটাল ঘড়ি দিয়ে ফেসবুকে প্রচার চালান। নাঈম ইসলাম ওই হল শাখা শিবিরের সভাপতি এবং সাব্বির হোসাইন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ শিবিরের প্যানেল থেকে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচন করবেন। তিনি ছাত্রদের হলে হলে আকর্ষণীয় প্যাকেটে মুড়িয়ে আতর বিতরণ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
এ ছাড়া শিবিরের প্যানেল থেকে বিভিন্ন হলের মসজিদে দেওয়া হচ্ছে বই, পুস্তিকা ও বুক শেলফ। এর নাম দেওয়া হচ্ছে ‘মসজিদভিত্তিক বুক কর্নার’। এভাবে হলে হলে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা শিক্ষার্থীদের মনোরঞ্জন করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও রাকসুর ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের’ ভিপি পদপ্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘আমরা আচরণবিধি অনুযায়ী নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছি। আমরা এটা মেনেই সামনের দিনগুলোতে প্রচার চালাব। আচরণবিধিতে টাকা খরচের নির্দিষ্টতা থাকলে আমরা সেটিও মেনেই প্রচার চালাতাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামিক আদর্শের সঙ্গে মিলে এমন উপহার আমরা আগেও শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করেছি। আগে বহুবার আমরা কোরআন শরিফ বিতরণ করেছি। আমার বহু দিনের ইচ্ছা ছিল শিক্ষার্থীদের মাঝে আতর বিতরণ করা। এবার শিক্ষার্থীদের দোয়া নিতে যেহেতু হলে হলে যাচ্ছিলাম, তাই হাদিয়া হিসেবে তাদের আতর দিয়েছি। কেউ না নিতে চাইলে আমরা তাদের জোরাজুরি করিনি। ভোটে প্রভাব ফেলতে এসব বিতরণ করিনি।’
কোণঠাসা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা
নির্বাচন ঘিরে এমন ‘উপঢৌকন’ বিতরণ নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিতকরণে একটি বাধা বলে মনে করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তারা বলছেন, ‘দলীয় প্রার্থীদের দলীয় ফান্ডিং আছে, যা আমাদের মতো সাধারণ প্রার্থীদের পক্ষে আনা অসম্ভব। তারা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য অনেক টাকা খরচ করছেন। আমরা খরচের বিষয়টি নির্দিষ্ট করতে বারবার প্রশাসনকে বলার পরেও খুব বেশি কাজ হচ্ছে না। প্রশাসন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।’
স্বতন্ত্র এজিএস প্রার্থী শাহ পরান লিখন বলেন, ‘আমাদের মতো যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন, তাদের নির্বাচনের খরচ খুব কম। দলীয় প্রার্থীদের অর্থের ছড়াছড়ি আমাদের জন্য একটা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।’
সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি পদপ্রার্থী ইরফান তামিম বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে ভোটারদের উপঢৌকন দেওয়া সম্ভব না। কিন্তু যাদের ফান্ড আছে এরা সহজেই শিক্ষার্থীদের কাছে টানার চেষ্টা চালাচ্ছেন। নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন তারা। নির্বাচন কমিশনের কাছে আমার দাবি, এসব প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হোক।’
জানতে চাইলে রাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক প্রার্থী তোফায়েল আহমেদ তোফা বলেন, ‘পার্টিজান প্যানেলগুলো অনেক ফান্ড থাকলেও নন-পার্টিজানদের ক্যাম্পাসে পরিচিতি আছে। টাকা থেকে ক্যাম্পাসে আমরা যে কাজ করেছি শিক্ষার্থীরা মনে রাখবেন। আমাদের মতো নন-পার্টিজানদের স্বাভাবিকভাবেই ফান্ড থাকবে না। তাই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য খরচের বিষয়টি অবশ্যই নির্দিষ্ট করতে হবে।’
স্বতন্ত্র বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক প্রার্থী আশরাফুল ইসলাম সন্ধি বলেন, ‘দলীয় প্রার্থীদের দলীয় ফান্ডিং আছে যা আমাদের মতো সাধারণ প্রার্থীদের পক্ষে আনা অসম্ভব। তারা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য অনেক টাকা খরচ করছেন। আমরা খরচের বিষয়টি নির্দিষ্ট করতে বারবার প্রশাসনকে বলার পরও খুব বেশি কাজ হচ্ছে না। প্রশাসন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।’
ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের জিএস প্রার্থী নাফিউল জীবন বলেন, ‘আমাদের দল নির্বাচনি মাঠে কোনো উপঢৌকন দিচ্ছে না। একটি দল উপঢৌকনের মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেক ম্যাচিউরড। তারা যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দেবেন।’
নির্বাচন কমিশন লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি করতে ব্যর্থ উল্লেখ করে শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি ও ভিপি পদপ্রার্থী মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি দেখছি একটা পক্ষ হলে আতর বিতরণ করছে, মুড়ি পার্টি করছে। বিশেষ করে আতর বিতরণ আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আচরণবিধিতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যানার, ফেস্টুন লাগানো যাবে না। কিন্তু এ সবকিছু হলেও নির্বাচন কমিশন নির্বিকার রয়েছে।’
সার্বিক বিষয়ে রাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘কেউ এ ধরনের কাজ করতে পারবে না। বিষয়টি আমরা অবগত ছিলাম না। প্রাধ্যক্ষদের নিয়ে একটি সভা করেছি। সেখানে বিষয়গুলো নিয়ে প্রাধ্যক্ষদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে সেগুলো হলো থেকে সরানো হয়। কেউ আর এ ধরনের কার্যক্রম করতে পারবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ না করা পর্যন্ত আমরা ব্যবস্থা নিতে পারছি না। আচরণবিধি নিয়ে কিছু সমস্যা আমরা খেয়াল করছি। আচরণবিধিতে সংযুক্ত করব।’
লটারির মাধ্যমে ব্যালট নম্বর প্রদান
রাকসু নির্বাচনে প্রতি পদের বিপরীতে প্রার্থীদের প্রত্যেকের মাঝে লটারির মাধ্যমে ব্যালট নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল বেলা ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ব্যালট প্রদানে লটারির আয়োজন করা হয়।
শনিবার কয়েকটি প্যানেলের নেতারা নির্বাচন কমিশনে গিয়ে ব্যালট নম্বর বরাদ্দ পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তোলেন। পরে রাতে নির্বাচন কমিশনের জরুরি সভায় নীতিমালা সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের পূর্বের নীতিমালার ৬ (৪) ধারা অনুযায়ী ‘প্রার্থীদের তালিকা প্যানেল আকারে জমা হলে লটারির মাধ্যমে প্যানেলের ক্রমধারা নির্ধারিত হবে। নির্বাচন কমিশন স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নামের তালিকা বাংলা বর্ণমালার আদ্যক্ষর ক্রমানুসারে প্রকাশ করবে।’
আরও দুই প্যানেল ঘোষণা
এদিকে রাকসু নির্বাচনে আরও দুটি ‘অপূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র প্যানেল’ ঘোষণা করা হয়েছে। ‘ইনডিপেনডেন্ট স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্স’ এবং ‘ইউনাইটেড ফর রাইটস’ নামক দুটি প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে।
গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেটে পৃথক দুই সংবাদ সম্মেলনে এ প্যানেলের ঘোষণা দেওয়া হয়। ‘ইনডিপেনডেন্ট স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্স’র ভিপি পদে রয়েছেন আশিকুল্লাহ মুহিব, জিএস পদে আব্দুল মুকিত। তবে ‘ইউনাইটেড ফর রাইটস’ প্যানেলের শীর্ষ পদে কোনো প্রার্থী তারা দিতে পারেনি। কয়েকটি সম্পাদকীয় পদ এবং কার্যনির্বাহী সদস্য পদে মোট ১১ সদস্যের প্রার্থী নিয়ে প্যানেল ঘোষণা করেছে।