ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। হাতে আছে আর মাত্র ২ দিন। প্রতীক্ষিত এ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আগ্রহ থাকলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী ভোট দিতে নিজ নিজ এলাকায় যাচ্ছেন না। আশ্চর্যজনকভাবে, এ তালিকায় রয়েছেন জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া সম্মুখ সারির আন্দোলনকারীরাও। আর্থিক সংকট, নিরাপত্তার শঙ্কা, একাডেমিক ব্যস্ততা এবং ব্যক্তিগত কাজের চাপে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে পিছিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
শিক্ষার্থীরা জানান, ভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবতার কারণেই তারা ভোট দিতে পারছেন না। বিশেষ করে দূরত্ব ও যাতায়াত ব্যয়ের বিষয়টি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে সামনে এসেছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নির্বাচন উপলক্ষে আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা থাকলে তারা ভোট দিতে যাওয়ার সুযোগ পেতেন।
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা এবং এর পরপরই ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি থাকায় সূচিগত জটিলতাও শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী জানান, এই ধারাবাহিক একাডেমিক ক্যালেন্ডারের কারণে স্বল্প সময়ের জন্য ক্যাম্পাস ছেড়ে বাড়ি যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
এ বিষয়ে ভোট দিতে না গিয়ে চবির আলাওল হলে অবস্থান করা ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তৌফিক বলেন, “আমি যদি আমার কথাই বলি তাহলে আমার বাড়ি হলো নীলফামারী। এখান থেকে আমার যাওয়া–আসার খরচ প্রায় তিন থেকে চার হাজার টাকা। আরেকটি বড় বিষয় হলো সামনে ঈদুল ফিতরের ছুটি আসছে। এখন যদি আমরা এর মধ্যে বাসায় গিয়ে ভোট দিয়ে আসি, দশ দিন ক্লাস করার পর আবার ছুটি। এজন্যই আসলে সবাই বাসায় যাচ্ছে না। ট্রান্সপোর্টেশন খরচটি আসলে অনেক বড়।”
হলে বর্তমানে কত সংখ্যক শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “৫০ শতাংশের অধিক শিক্ষার্থী হলে অবস্থান করছেন বলে আমি মনে করি।”
শুধু সাধারণ শিক্ষার্থীরাই নন, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া সম্মুখ সারির আন্দোলনকারীরাও এবার ভোট দিতে যাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির নারী আন্দোলনকারী ও ‘জুলাই কন্যা’ পদকপ্রাপ্ত বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মারিয়া বলেন, “আমার টিউশন আছে। সেগুলোর জন্য আমি বাড়িতে যেতে পারছি না। তাছাড়া আমাদের নিরাপত্তাজনিত কিছু ইস্যু আছে। পাঁচ বছর পর একটি নির্বাচন হচ্ছে, এটাকে আমরা অন্যরকম একটি নির্বাচন বলতে পারি সেক্ষেত্রে নিরাপত্তা ইস্যু তো আছেই। সবকিছু মিলিয়ে বাড়িতে যাওয়া আসলে হয়ে উঠছে না।” তিনি আরও যোগ করেন, “এখানে আমাদের যদি আলাদাভাবে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা থাকত তাহলে ভালো হতো।”
একইভাবে জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন সম্মুখ সারির আন্দোলনকারী রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সুমনও এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের পর এবার আমাদের ভোট হচ্ছে। আমাদের সকলেরই আকাঙ্ক্ষা ছিল এবার একটা ভালো সরকার আসবে। সে হিসেবে সকলেরই ভোট দেওয়া উচিত। কিন্তু নানা রকম প্রতিকূলতার কারণে অনেকে ভোট দিতে পারছে না। যাদের বাড়ি দূরে, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের দিকে, তারা যদি ভোট দিতে চায় তাহলে তিন থেকে চার হাজার টাকা খরচ হয়। এটা অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য।”
নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “বর্তমানে যে পরিস্থিতি, আদৌ কি স্বচ্ছ নির্বাচন হবে কিনা তা নিয়েও আমাদের আশঙ্কা রয়েছে। আমরা দেখেছি জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশ আগে যেখানে ছিল, সেখানেই রয়ে গিয়েছে। যেমন সিন্ডিকেট ছিল, তেমনি আছে। দেশে কোনো ধরনের পরিবর্তন হয়নি। এখনো আমাদের ঐরকম আশঙ্কা রয়েছে যে পরবর্তী গভর্নমেন্ট আসলে দেশের পরিস্থিতি ঠিক করতে পারবে কিনা।”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল যাদের বাড়ি দূরে, এমন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তত পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা করা।”
সুমন আরও যোগ করেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী আছেন যারা রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, তারা সেই ফায়দা ওসুলের জন্য বাড়ি চলে গিয়েছে। এটাকে আমরা মজা করে ‘নির্বাচনি খ্যাপ’ বলি। আমরা যারা রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নই, আমাদের রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। এ কারণেই মূলত অনেক শিক্ষার্থী হলে অবস্থান করছে।”
ভোট দিতে না যাওয়া ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী অর্পিতা জানান, “আমার ভোট দিতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আমরা যারা শিক্ষার্থী, আমাদের অনেক রকম কাজ রয়েছে। অনেকের টিউশন আছে, অনেকের নির্বাচনের পরপরই পরীক্ষা। আবার যাদের টিউশন নেই, তারাও যাচ্ছে না। কারণ ভোট দিতে গিয়ে যাতায়াত খরচ দিয়ে আবার ক্যাম্পাসে ফিরলে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। এ কারণেই অনেকে যেতে পারছে না। এখান থেকে যদি কোনো ধরনের ট্রান্সপোর্টেশন ব্যবস্থা করে দেওয়া হতো, তাহলে মনে করি অনেক মানুষ ভোট দিতে যেতে পারত।”
এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বা ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা, কিংবা বিকল্প ভোটিং পদ্ধতি চালু করা হলে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাহফুজ/