হিমশীতল হাওয়া, বাতাসে চা পাতার গন্ধ আর তারুণ্যের কলরব, এই নিয়েই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) প্রাণকেন্দ্র কামাল-রঞ্জিত (কেআর) মার্কেট। সূর্যমামা যখন পশ্চিমে, ক্যাম্পাসের গোধূলি তখন অন্য এক রূপ ধারণ করে। হলের ডাইনিংয়ের ব্যস্ততা কিংবা লাইব্রেরির নিস্তব্ধতা ছেড়ে একদল শিক্ষার্থী ছুটে আসেন কেআর-এর চায়ের দোকানগুলোতে। সেখানে জীর্ণ বেঞ্চে কিংবা দাঁড়িয়ে থাকা ভিড়ে নেই কোনো আভিজাত্য, আছে শুধু এক পরম প্রশান্তি।
কেআর মার্কেটের প্রতিটি চায়ের দোকানের গল্প আলাদা। চা বানানোর প্রধান উপকরণ গরম পানি আর চা পাতা হলেও, এখানে মামাদের হাতের জাদুতে প্রতিটি কাপ হয়ে ওঠে অনন্য। চা তৈরির প্রক্রিয়াটিও বেশ উপভোগ্য। বড় সিলভারের কেটলিতে চলে চায়ের লিকার তৈরির কাজ। অন্য পাতিলে দুধ-চায়ের বিশেষ আয়োজন। সব মিলিয়ে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।
কারও জন্য লেবু-আদার কড়া লিকার, কারও পছন্দ লবঙ্গ-দারুচিনির সুঘ্রাণে লাল চা। আবার একদল আছে যাদের কাছে চা মানেই মালাই চা। চিনি বেশি হবে কি হবে না, লিকার একটু কড়া হবে কি না- এমন শত শত আবদার এক হাতে সামলান ব্যস্ত মামারা। প্রতিটি কাপের সঙ্গে তিনি যেন পরিবেশন করেন এক চিমটি ভালোবাসা।
চায়ের কাপ হাতে পেয়ে ফোনে সেই মুহূর্ত বন্দি করা যেন এক অলিখিত নিয়ম। তবে এই কাজ অনেকে উপেক্ষা করে দৃশ্যটি শুধু স্মৃতির পাতায় রেখে দেন। সে যেভাবেই হোক, পরিশেষে সবার মূল উদ্দেশ্য ওই মুহূর্তকে উপভোগ করা।
এখানেই তৈরি হয় ভবিষ্যতের সব রঙিন পরিকল্পনার গল্প। সন্ধ্যায় কোনো এক কোণে হয়তো গিটারের ঝংকারে বেজে ওঠে পুরোনো দিনের গান, অন্য কোণে চলে রাজনীতি নিয়ে তুমুল আলোচনা। কেউবা নিছক হা-হুতাশ করে বলেন, ‘এই পরিকল্পনাটা মনে হয় এবারও অপূর্ণ থেকে যাবে।’ তবুও হাসি থামে না। কারণ সবাই জানে, পরদিন ঠিক এই সময়েই আবার দেখা হবে সেই চিরচেনা স্থানে। পরিশেষে সকল ভাবনাকে সঙ্গী করে আড্ডার সমাপ্তিও ঘটে এখানেই।
এ সম্পর্কে কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের শিক্ষার্থী জয়ীতা সরকার পূজা বলেন, ‘বাকৃবির প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য চা কেবল একটি ক্যাফেইন থেরাপি নয়, এটি এক পূর্ণতার বহিঃপ্রকাশ। সকালে শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার আগে এক কাপ চা যেমন মস্তিষ্ককে সচল করে, তেমনি দুপুরে বা রাতের খাবারের পর এক কাপ চা ছাড়া তৃপ্তি যেন আসতেই চায় না। ল্যাবের দীর্ঘ বিরতিতে কিংবা দীর্ঘ লেকচার শেষে নিজ গন্তব্যে যাওয়ার পথে চায়ের দোকানে এক চক্কর না দিলে দিনটাই অপূর্ণ থেকে যায়। বিশেষ করে শীতের সন্ধ্যায় কুয়াশাভেজা ক্যাম্পাসে যখন গিটারের সুর ভাসে, তখন এক কাপ গরম চা প্রশান্তির মতো কাজ করে।’
কেআর মার্কেট শুধু একটি বাজার নয়, এটি যেন বাকৃবির এক জীবন্ত দর্পণ। যেখানে প্রতিটি কাপে প্রতিফলিত হয় হাজারও শিক্ষার্থীর স্বপ্ন আর ক্লান্তি।
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ