চলছে মাহে রমজান। আত্মসংযম, ধৈর্য আর সহনশীলতার এই মাসে দিনভর সিয়াম সাধনার পর ইফতার ঘিরে তৈরি হয় এক অন্য রকম আবহ। পরিবার-পরিজনের পাশাপাশি অনেকেই বন্ধুদের সঙ্গে বসে ইফতার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সেই চিত্রই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রাজশাহী কলেজ ক্যাম্পাসে।
প্রতিদিন বিকেলে কলেজের নির্ধারিত মাঠে জড়ো হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। কেউ চট, কেউবা চাদর পেতে বসার জায়গা ঠিক করছেন। কেউ প্লেট সাজাচ্ছেন, কেউ ফল কাটছেন, আবার কেউ মুড়ি মাখাচ্ছেন। ইফতারের আগমুহূর্তে মাঠজুড়ে তৈরি হয় এক প্রাণবন্ত ব্যস্ততা। পড়াশোনার চাপ আর একাডেমিক ব্যস্ততার ফাঁকে এই সম্মিলিত আয়োজন যেন শিক্ষার্থীদের এনে দিচ্ছে অন্য রকম স্বস্তি।
আজানের অপেক্ষায় কেউ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে, কেউবা ফোনের স্ক্রিনে সময় দেখছেন বারবার। এরই মাঝে চলছে আড্ডা, ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে আলোচনা কিংবা রোজার অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি। গাছে ফুটে থাকা ফুলের সৌন্দর্য আর খোলা আকাশের নিচে বসে ইফতার— সব মিলিয়ে ক্যাম্পাস যেন হয়ে উঠছে আরও মনোরম।
আজানের ধ্বনি ভেসে আসার সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তেই বদলে যায় পরিবেশ। কিছুক্ষণ আগের উচ্ছ্বাস থেমে গিয়ে নেমে আসে এক শান্ত, পবিত্র আবহ। দোয়া শেষে শুরু হয় ইফতার। বিভিন্ন বিভাগ থেকেও আয়োজন করা হচ্ছে সম্মিলিত ইফতারের। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে পারস্পরিক বন্ধন।
রাজশাহী শহরে খোলা জায়গার অভাব থাকায় অনেক বহিরাগতও কলেজ মাঠে ইফতার করতে আসছেন। তাদের একজন জানান, খোলা ও শান্ত পরিবেশে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে বসে ইফতার করার সুযোগই তাকে এখানে টানে।
এই আয়োজনের আরেকটি দিক হলো সম্প্রীতির ছবি। মুসলিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নিচ্ছেন অন্যান্য ধর্মের বন্ধুরাও। এক সঙ্গে বসে গল্প, আড্ডা আর খাবার ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে গড়ে উঠছে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক।
প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মনিসা সরকার বলেন, সবাই মিলে বসে সময় কাটানোটা তার কাছে দারুণ লেগেছে। খাবার সাজানো থেকে শুরু করে আজানের অপেক্ষা— সবকিছুতেই ছিল অংশগ্রহণ। কখনো মনে হয়নি ধর্ম আলাদা বলে কেউ আলাদা। তার ভাষায়, পুরো আয়োজনটাই ছিল বন্ধুত্ব আর সম্প্রীতির এক সুন্দর অভিজ্ঞতা।
ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. শাহেদ ইসলাম জানান, বন্ধুদের নিয়ে প্রথমবার কলেজ মাঠে ইফতার করা তার জন্য অন্য রকম এক অনুভূতি। ঈদের আগমনী আনন্দ যেন আগেভাগেই ভাগাভাগি হয়ে গেছে সবার মাঝে।
ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মারুফ হোসেন আসিক বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই রমজানে এই ক্যাম্পাসে ইফতার করার চেষ্টা করেন তিনি। পুরোনো দিনের আড্ডা আর এক সঙ্গে বসে ইফতারের স্মৃতি তাকে বারবার টেনে আনে। ব্যস্ত জীবনে এই সময়টুকু তার কাছে মানসিক প্রশান্তির মতো।
সব মিলিয়ে ইফতারকে ঘিরে রাজশাহী কলেজ ক্যাম্পাসে যে দৃশ্য ফুটে উঠছে, তা কেবল খাবারের আয়োজন নয়। এটি হয়ে উঠেছে সম্প্রীতি, বন্ধুত্ব ও মানবিক বন্ধনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
লেখিকা: শিক্ষার্থী ও সহযোগী সদস্য, রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি