জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে আছে একটি সংগঠন- যার বয়স স্বাধীন বাংলাদেশের প্রায় সমান। সময়ের হিসেবে ৫৪ বছর ইতিহাসের তুলনায় হয়তো ক্ষুদ্র, কিন্তু একটি ক্যাম্পাস সাংবাদিক সংগঠনের জন্য এটি এক দীর্ঘ সংগ্রাম, বিকাশ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার গল্প। সেই গল্পের নাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (জাবিসাস)।
১৯৭২ সালের ৩ এপ্রিল, সদ্য স্বাধীন দেশের পুনর্গঠনের সময়, মাত্র সাতজন স্বপ্নবাজ তরুণের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে জাবিসাস। আল বেরুনী হলের ক্যান্টিন সংলগ্ন ছোট্ট একটি কক্ষে কয়েকটি চেয়ার-টেবিল নিয়ে শুরু হওয়া এই সংগঠন আজ দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ক্যাম্পাস সাংবাদিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে।
প্রথম সভাপতি ছিলেন পরিসংখ্যান বিভাগের রাশেদ আহমেদ আলী এবং সাধারণ সম্পাদক অর্থনীতি বিভাগের আবুল কাসেম। তৎকালীন উপাচার্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর সহযোগিতায় শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।
মিথ ভেঙে সত্য বলার সাহস
শুরু থেকেই জাবিসাসের অবস্থান ছিল স্পষ্ট- ‘সত্য যত তিক্তই হোক, তা বলতে হবে।’ যখন প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির অজুহাতে নেতিবাচক বিষয়গুলো আড়াল করার প্রবণতা দেখা যায়, তখন জাবিসাস দাঁড়িয়েছে তার বিপরীতে। ক্যাম্পাসের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবিচার তুলে ধরে তারা হয়ে উঠেছে সত্যের নির্ভীক কণ্ঠস্বর।’
জাবিসাসের সাধারণ সম্পাদক রাজিব রায়হান বলেন, ‘দীর্ঘ পথচলায় জাবিসাস শুধু সংবাদ পরিবেশন করেনি, বরং বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যের সন্ধানে ক্যাম্পাসের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল ভাবমূর্তি তুলে ধরতে আমাদের কলম সবসময় সচল ছিল।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘ভবিষ্যতেও আমরা এই সাহসিকতা ও নিরপেক্ষতার ধারা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। আসুন, এই বিশেষ দিনে আমরা পুনরায় শপথ নিই- সব ধরনের প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে দেশ ও দশের কল্যাণে আমাদের কলমকে আরও শাণিত করি।’
আন্দোলন, প্রতিবাদ ও দায়িত্বশীলতা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জাবিসাসের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এসব প্রতিবেদন ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়েও আলোড়ন তুলেছে।
সংগঠনের সভাপতি মাহ্ আলম বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি ৫৪ বছরের এক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। এই সংগঠনের সদস্যরা অতীতের মতোই ক্যাম্পাসের সকল অন্যায়, অবিচার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে সোচ্চার থেকেছে এবং ভবিষ্যতেও সেই সাহসী ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সত্য, ন্যায় ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চার পাশাপাশি সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তার বিকাশে জাবিসাস সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। এই ধারাবাহিকতা অটুট থাকুক- এই প্রত্যাশাই আজকের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার।’
অতীতের শিক্ষা, ভবিষ্যতের পথ
জাবিসাসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি মো. আনোয়ারুল ইসলাম (১৯৮৭–৮৯) সংগঠনটির দীর্ঘ পথচলায় যুক্ত সবার প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘দেশের ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রথম সাংবাদিক সংগঠন হিসেবে জাবিসাসের দীর্ঘ চুয়ান্ন বছর পার করায় এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুভেচ্ছা।’
বর্তমান প্রজন্মের জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাস ভিত্তিক সাংবাদিকতা করলে সেখানে সর্বপ্রথম গুরুত্ব পাবে ছাত্রত্ব। একাডেমিক পড়াশোনা শেষে অতিরিক্ত হিসেবে সাংবাদিকতা করবে। তবে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে যেন অ্যাকটিভিজম না হয়ে যায়- সেটা মনোযোগী হয়ে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। সাংবাদিকদের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ভালো সাংবাদিক হতে হলে সাংবাদিক নেতৃত্বের চেয়ে রিপোর্টিংয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’
স্মৃতির ভাঁজে, প্রেরণার আলো
জাবিসাসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শৈবালেন্দু প্রকাশ গুণ (১৯৭৭–৭৮) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘আজ জাবিসাসের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আমি ১৯৭৬ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত জাবিসাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বর্তমান জাবিসাসের সকলকে শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও অভিনন্দন জানাই।’
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও পেশাদারত্বের চর্চা
জাবিসাস কেবল সংবাদ পরিবেশনেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবছর ‘সেরা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার’ প্রদান এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালার মাধ্যমে দক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিক তৈরির কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়েও জাবিসাস বরাবর সোচ্চার। কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হলে প্রতিবাদ গড়ে তোলা এবং পাশে দাঁড়ানো তার ঐতিহ্যের অংশ।
গণতান্ত্রিক ধারা ও নেতৃত্ব তৈরির কারখানা
সূচনালগ্ন থেকেই গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালিত হয়ে আসছে জাবিসাস। সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে ইতোমধ্যে ৪৪টিরও বেশি কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত হয়েছে- ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় এ এক অনন্য নজির। এখান থেকে উঠে আসা অনেক সাংবাদিক আজ দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা গণমাধ্যমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সামনে এগোনোর প্রত্যয়
ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাবিসাস এখন আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী। নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য তৈরি করছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। ৫৪ বছরে পদার্পণের এই মাইলফলকে দাঁড়িয়ে সংগঠনটি আবারও জানিয়ে দিচ্ছে- সত্যের পথে আপস নেই, দায়িত্বশীলতার জায়গায় কোনো ছাড় নেই। জাবিসাস শুধু একটি সংগঠন নয়- এটি একটি চেতনা, একটি সাহস, একটি নিরবচ্ছিন্ন আলোকবর্তিকা; যা ভবিষ্যতেও ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার পথ দেখাবে।
আমানউল্লাহ খান/অমিয়/