রাষ্ট্র বা সরকারের প্রয়োজন নয়, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
মঙ্গলবার (১২ মে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার আর্টস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘Making and Unmaking: A Study of Amendments to the Bangladesh Constitutions’ শীর্ষক এক বিশেষ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ ও বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি যৌথ উদ্যোগে সেমিনারটি আয়োজন করে।
উপাচার্য বলেন, “এদেশে কখনও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, কখনও বা সরকারের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। আমরা চাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আগ্রহে নয়, বরং জনগণের চাহিদা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হোক। তাহলে সেই সংস্কার টেকসই হবে এবং জাতি উপকৃত হবে।”
তিনি আরও বলেন, “মাঝেমধ্যে সংবিধান পরিবর্তিত হয় রাষ্ট্রের বাহাদুরির জন্য। সংবিধানের যৌক্তিক সংশোধন করেছিলেন জিয়াউর রহমান। এরপর করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে যেন আবার রাজপথে নামতে না হয়, সে ধরনের পরিবেশ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আহমেদ আবদুল্লাহ জামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। প্রবন্ধকারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরেন ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আজরিন আফরিন। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা ইতিহাস সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. এস এম রেজাউল করিম। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার এবং ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আশফাক হোসেন।
সেমিনারে ড. শাহদীন মালিক বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন সংশোধনীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে গণতন্ত্র, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সংবিধান কেবল একটি আইনি দলিল নয়, বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, “বাংলাদেশের সংবিধান বারবার সংশোধিত হয়েছে কখনও রাজনৈতিক বাস্তবতায়, কখনও ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রয়োজন থেকে। কিন্তু প্রতিটি সংশোধনী যে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে, তা নয়। কিছু সংশোধনী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করেছে, আবার কিছু সংশোধনী নাগরিক অধিকারের ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।”
তিনি আরও বলেন, সংবিধানকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে জনগণের আকাঙ্ক্ষার দলিল হিসেবে দেখতে হবে। একটি কার্যকর ও টেকসই সংবিধানের জন্য রাজনৈতিক সহনশীলতা, জবাবদিহিতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। ভবিষ্যতের যেকোনো সংবিধান সংস্কার হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, গণমুখী ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধনির্ভর।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার বলেন, “ইতিহাস ছাড়া আমাদের চলার সুযোগ নেই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার নিজেদের প্রয়োজনে ইতিহাসকে বিকৃত করেছে। তরুণ প্রজন্মের কাছে সঠিক ও সুন্দর ইতিহাস তুলে ধরতে হবে।”
অধ্যাপক ড. এস এম রেজাউল করিম স্বাগত বক্তব্যে সেমিনারের প্রাসঙ্গিকতা, ইতিহাসচর্চার গুরুত্ব এবং সংবিধান বিষয়ে একাডেমিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সংবিধান শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো নয়, এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন। সংবিধানের সংশোধনীগুলোকে কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের দৃষ্টিতে দেখলে হবে না, এর সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রভাবও বিশ্লেষণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে মুক্তবুদ্ধি ও সমালোচনামূলক চিন্তার জায়গা। তাই সংবিধান, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর আলোচনা ও গবেষণার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। এই সেমিনারের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মধ্যে নতুন চিন্তার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আমরা আশা করি।”
আরিফ জাওয়াদ/এসএন