চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে ডিমের দাম কমলেও প্রভাব পড়েনি খুচরা বাজারে। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিটি ডিমে পাইকারিতে ১ টাকা ৭০ পয়সা কমে গেছে। তবে খুচরা বাজারে পণ্যটি ২ টাকা ৩ পয়সা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে।
সপ্তাহখানেক আগে পাহাড়তলী বাজারে প্রতিটি ডিম বিক্রি হয়েছে ১৩ টাকায়। বর্তমানে প্রতিটি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১১ টাকা ৩০ পয়সায়। কিন্তু পাইকারি বাজারে দাম কমার প্রভাব পড়েনি খুচরা বাজারে। সেখানে এখনো প্রতিটি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩ টাকা ৩৩ পয়সায়।
পাহাড়তলী বাজারের ডিমের আড়তদাররা জানিয়েছেন, ডিম আমদানি, বিশেষ টাস্কফোর্স কমিটির তদারকিসহ সরকারের নানামুখী সিদ্ধান্ত, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ, দফায় দফায় অভিযানের কারণে কমেছে ডিমের দাম। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আড়তদাররা বর্তমানে প্রতিটি ডিম সরকারনির্ধারিত দর ১১ টাকা ১ পয়সায় বিক্রি করছে। বুধবার পাহাড়তলীতে টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৮টি গাড়িতে ডিম এসেছে। এসব ডিম পাহাড়তলী বাজারে মঙ্গলবার বিক্রি হয়েছে ১১ টাকা ৫০ পয়সায়। বুধবার ১১ টাকা ৩০ পয়সায়।
চট্টগ্রাম ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল শুক্কুর লিটন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা সরকারনির্ধারিত দরে টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ডিম কিনতে পারছি। তাই ডিমের দাম কমতে শুরু করেছে। শীতকাল আসছে। বাজারে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়ায় এই মৌসুমে ডিমের চাহিদা অনেক কমে যায়। তাই আশা করছি, সামনে ডিমের দাম আরও কমে যাবে।’
এদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা বাজারে ডিমের দর যাচাই করেছে খবরের কাগজ। চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালি, কাজীর দেউড়ি ও হালিশহর এলাকায় প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায়। অন্যদিকে নগরীর লাভ লেইন এলাকায় প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকায়।
নগরীর হালিশহর এলাকার আল মোক্কা স্টোরের মো. শোয়েব খবরের কাগজকে বলেন, ‘বুধবার থেকে পাইকারি বাজারে ডিমের দাম কমতে শুরু করেছে। আমার কাছে বর্তমানে যে ডিমগুলো আছে সেগুলো এক দিন আগে কেনা। তাই নতুন দামের প্রভাব পড়েনি। বৃহস্পতিবার (আজ) ডিমের চালান আসবে। আশা করছি ক্রেতারা আরও কম দামে ডিম পাবেন।’
নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকার বাসিন্দা মো. এনাম আবেদিন বলেন, ‘গণমাধ্যমে দেখলাম ডিমের দাম কমেছে। কিন্তু কই? বাস্তবতা তো তার উল্টো। আমাদের এখনো প্রতি ডজন ডিম ১৬৫ টাকা করে কিনতে হচ্ছে। আমরা তো কোনো সুফল পাচ্ছি না। খুচরা ব্যবসায়ীরা যেভাবে পারছেন আমাদের গলা কাটছেন। সরকার ও প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, খুচরাপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হোক।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রামের সভাপতি ও বিশেষ টাস্কেফোর্স কমিটির সদস্য এস এম নাজের হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতিদিন নগরীর বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখনো মূল্যতালিকা, ক্রয়-বিক্রয় রসিদ না রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে কত টাকায় কিনছেন এবং কত টাকায় বিক্রি করছেন, সেটা বোঝা মুশকিল। কাজেই ব্যবসায়ীদেরই দেশের ও ভোক্তার কল্যাণের স্বার্থে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।’
বন্যার অজুহাতে গত আগস্টের শেষের দিক থেকে ডিমের দামে শুরু হয় নানা নাটকীয়তা। গত ৮ সেপ্টেম্বর ভারত থেকে ২ লাখ ৩১ হাজার ৮৪০ পিস ডিম আমদানি হয়। তবে এর বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়েনি বাজারে। ব্যবসায়ীরা অসাধুতার সীমা ছাড়িয়ে গেলে গত ১৫ সেপ্টেম্বর পণ্যটির দাম বেঁধে দেয় সরকার। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখান ব্যবসায়ীরা। এরপর বিভিন্ন পোলট্রি ফার্ম, আড়তদার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা শুরু করেন নতুন খেলা। পাইকারের কাছে বিক্রি করার সময় রসিদে লেখা থাকে সরকারনির্ধারিত দর, অর্থাৎ ১১ টাকা ১ পয়সা। কিন্তু চট্টগ্রামের পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন মূলত ১১ টাকা ৮০ থেকে ১১ টাকা ৮৫ পয়সায়। এভাবে চলে কারসাজি, আর কোটি কোটি টাকার লুটপাট।
পাহাড়তলীতে গত আগস্ট থেকে গড়ে ১২ টাকার ওপরে প্রতিটি ডিম বিক্রি হয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি এসে পাইকারি বাজারে প্রতিটি ডিম বিক্রি হয় ১৩ টাকার ওপরে। সরকারের নির্ধারিত দামে ডিম কিনতে না পারা, রসিদ না দেওয়া, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে জরিমানার কারণে গতকাল ১৪ ও ১৫ অক্টোবর ডিম বেচাকেনা বন্ধ রাখেন পাহাড়তলীর অন্তত ১৫ জন আড়তদার।
এদিকে গত ৮ অক্টোবর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী সাড়ে চার কোটি ডিম আমদানির অনুমোদন দেয় সরকার। তার ওপর ডিমের আমদানি ব্যয় কমিয়ে আনতে সাময়িকভাবে পণ্যটির শুল্ক মওকুফের অনুরোধ জানিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দেয় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। এরপর গত ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় ডিমের দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। গত ২১ অক্টোবর বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আসা ২ লাখ ৩২ হাজার ডিম খালাস হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার দেশের বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ও দাম নিয়ন্ত্রণে আবারও ডিম আমদানির অনুমতি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এবার ১২টি প্রতিষ্ঠানকে চার কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। বর্তমানে নিম্নমুখী রয়েছে পণ্যটির দাম।
ডিমে কারসাজি, পাহাড়তলীর দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা
মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা, ক্রয়-বিক্রয় ভাউচার না রাখা এবং বেশি দামে বিক্রি করায় পাহাড়তলী বাজারে ডিমের দুই আড়তদারকে জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
বুধবার দুপুরে অভিযানটি পরিচালিত হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ, সহকারী পরিচালক মো. আনিছুর রহমান ও রানা দেবনাথ।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ খবরের কাগজকে বলেন, আড়তে হালনাগাদকৃত মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা, ক্রয়-বিক্রয় ভাউচার যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা এবং অতিরিক্ত মূল্যে ডিম বিক্রি করায় মেসার্স শাহজাহান স্টোরকে ৭০ হাজার টাকা ও মেসার্স বিছমিল্লাহ ট্রেডার্সকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।