রাঙ্গামাটির কাউখালীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও পিকআপের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ জনে।
নিহতরা হলেন- নুর নাহার (৪০), আবু তোবাব (৫০) ও মাহবুবুর রহমান বাচ্চুর (৫০), মিনু মারমা (৩৫), জয়নাল আবেদীন (৬০), ও সিএনজি চালক ইজাজুল (২৫)। তাদের মধ্যে নিহত নুর নাহার বেগমের ৮ মাসের একটি সন্তান রয়েছে।
মর্মান্তিক এই সড়ক দুর্ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার (২৬ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টায় রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া চেয়ারম্যান পাড়া এলাকায়।
রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের রাণীরহাট বাজার থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রাম থ-১১-৯১৭৩ নম্বরের যাত্রীবাহী সিনজি অটোরিকশাকে মুখোমুখি চাপা দেয় বিপরীত দিক থেকে আসা কাঠবোঝাই-চট্টমেট্রো-ন -১১-৬৪৯২ নম্বরের পিকআপ। এতে মুহুর্তেই দুমড়েমুচড়ে যাওয়া সিএনজির তিন যাত্রী দুর্ঘটনাস্থলে মারা যান।
তাৎক্ষণিকভাবে পথচারী ও স্থানীয়রা সিএনজির চালক ইজাজুল এবং আহত মিনু মারমা ও জয়নাল আবেদীনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। সেখানে তাদের মৃত্যুা হয়। এসময় ঘটনাস্থলে নিহত তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে কাউখালীর বেতবুনিয়া ফাঁড়িতে নিয়ে যায় পুলিশ। তবে দুর্ঘটনার পরপরই পিকআপ চালক ও সহকারী পালিয়ে যায়। পরে দুর্ঘটনার শিকার সিএনজি অটোরিকশা ও পিকআপটি উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয় বেতবুনিয়া ফাঁড়ির পুলিশ ।
নিহতদের মধ্যে নুর নাহার কাউখালী উপজেলার পশ্চিম মনাইটেক ও মিনু মারমা কাউখালীর বেতবুনিয়া এলাকার বাসিন্দা। এছাড়া আবু তোরাব চট্টগ্রামের রাউজান চৌধুরী পাড়া, মাহমুদুর রহমান বাচ্চু চট্টগ্রাম হাটহাজারীর ছাত্তারঘাট, মো. জয়নাল আবেদীন চট্টগ্রামের রাউজানের সুলতানপুর ও সিএনজি চালক ইজাজুল চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা।
এ দুর্ঘটনার জন্য কেউ কেউ দুষছেন সড়কের বাঁক-কে, কেউ বা চালকের অদক্ষতাকে। তবে দুর্ঘটনা বন্ধে সড়কটির বাঁককে সোজা ও প্রশস্ত করার দাবি জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
নুর নাহারের মোবাইল ফোনে নুর নাহারের মৃত্যুর খবর পেয়ে বেতবুনিয়া পুলিশ ফাঁড়িতে ছুটে এসেছেন তার স্বামী আব্দুর রহিম (৪৫)। বললেন-সকালে আমি কাজে গিয়েছি। আমার স্ত্রী রাণীরহাট বাজারে এসেছিল। সিএনজি করে বাজার নিয়ে ফিরছিল। সাড়ে দশটার দিকে তার ফোন থেকে কেউ একজন জানায় তার মৃত্যুর খবর। আমার ৮ মাসের দুধের বাচ্চার এখন কী হবে? আমার সংসারের কী হবে? আমার তিন সন্তানকে কে দেখবে? কার কাছে বিচার চাইব?
নিহত নুর নাহারের ভগ্নিপতি স্থানীয় বাসিন্দা মো. বেলাল বলেন- নুর নাহারের পরিবার গরীব। মামলা মোকদ্দমা করে পারবে না। ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় প্রানহানী না ঘটে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন- সড়কটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সরু। গেল ১৬ এপ্রিল ভোরে ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটিগামী রবি এক্সপ্রেসের সেন্টমার্টিন হুন্দাই এসি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে। এই ঘটনায় চালকসহ ৫ জন যাত্রী আহত হন। আজ আবার ৬ জনের মৃত্যু হলো। সড়কটির বাঁক সোজা ও প্রশস্ত করা খুবই জরুরি। নইলে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হতে থাকবে।
শনিবার ঘটনাস্থল ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছুটা ঢালু দুর্ঘটনা স্থলটিতে মূলত একাধিক বাঁক রয়েছে। বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি আগ থেকেই দৃষ্টিগোচর হয় না। ফলে দ্রতগতিতে চালাতে গিয়ে যানবাহন মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। আবার মূল সড়ক থেকে ছিটকে সড়কের প্রান্তের নালায় ও খাদে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানটিতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনা রোধে বাড়তি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
কাউখালী থানার অফিসার ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম সোহাগ বলেন- ঘটনাস্থলেই সিএনজির তিন যাত্রী নিহত হয়েছেন। হাসপাতালে নেওয়া হলে সিএনজি চালকসহ আরও তিন জন মারা গেছেন। সব মিলিয়ে ওই দুর্ঘটনায় সিএনজির চালক ও যাত্রীসহ ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাঙ্গামাটির মর্গে নিয়েছে। আইনী কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। দুর্ঘটনায় ক্ষতির শিকার কারো পক্ষ থেকে এখনও কেউ অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পাওয়া না গেলে পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করবে।
রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহপদুল ইসলাম বলেন- দুর্ঘটনার পর আমরা আইনী প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছি। পিকআপ চালক ও সহকারী পালিয়ে গেছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তদন্ত করে দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন করা হবে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যেই হোক তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সড়কটিতে যানবাহনের চাপ বেশি। রাঙ্গামাটিতে পর্যটক ছাড়াও বিপুল পরিমাণ যানবাহন চলাচল করে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি আমরা বিবেচনায় রাখছি।
জিয়াউর রহমান জুয়েল/মাহফুজ